সংসারখেলা
-----------
পারমিতা ঘোষ
মাটির সরায় নারকেল ছোবরার ফোঁটা ফোঁটা আগুনের ওপর ধুনো ছিটিয়ে নিয়ে, কমললতা রোজ সকালে একঘর থেকে আর একঘরে ঘুরে বেড়ায়। ছম্ ছম্ করে তার তিন পরতিয়া রূপোর নূপুর ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে শ্বেতপাথরে মোড়া বাড়িটার শিতল আনাচে কানাচে। ভেজা চুলের রাশি থেকে জল ঝরতে থাকে টুপ্ টাপ্। জরি সুতোর ফুলকারি তোলা আঁচলখানি রঙিন ছায়ার মত মেঝেতে লুটিয়ে পিছু নেয়। খাঁচায় সবুজ টিয়া তাকে দেখতে দেখতে ডাক তোলে - "ওগো শুনছো?"
ধূপ ধুনো দেওয়া সাঙ্গো করে, নিত্যপুজার পালা সেরে উঠতে রোজই বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর থাকে রান্নার পাট। নাপিতবৌ যখন আলতাপাতা আর নরুনকাঠি নিয়ে একতলার উঠোনে ঢুকে হাঁক দেয় - "কই গো বউ, ভাত খাওয়া হল তোমার", ততক্ষণে সূর্য ঘেঁটে যাওয়া সিঁদুর টিপের মত দিগন্ত জুড়ে বিছিয়ে যায়।
নাপিতবৌ লক্ষীবারে আসে আলতা পরাতে। সে অনেক রকম খোঁপা জানে, অমৃতিপাক, খেজুরছড়ি, প্রজাপতি। কমললতা প্রথমে হাসি মুখে জাফ্রি কাটা রেলিং থেকে ঝুঁকে পড়ে তাকে দেখে, তারপর দৌড়ে আসে।
আহ্লাদ করে বলে - "দিদি, আজ খোঁপায় তারাফুল গুঁজে দিও।"
- "দাঁড়াও বাপু, আগে জট ছাড়াই! তারপর তো খোঁপা! সোয়ামীসেবায় দিনরাত এক করে দিচ্চো, ইদিকে নিজের পানে নজর নেই। তা আজ কী রান্না করলে?"
- "শুক্তো, মুড়িঘন্ট, পোস্তর বড়া, বেগুন ভাজা, রুইয়ের কালিয়া ..."
- "একা হাতে এত কিচু!"
কমললতার মুখে রক্ত জমা হয়। - "উনি যে পাঁচরকম তরকারি ছাড়া খেতে পারেন না।"
- "ধন্যি বউ বটে। বলি, উনি কী একটু উটতে হাঁটতে পারচেন এদানিং?"
কমললতা অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়ে। নাপিতবৌ বেরোবার আগে বলে - "সাবধানে থেকো। এত বড় বাড়িতে দুজন মাত্তর থাকো, ভাবতেই ভয়ে বুক শুকিয়ে যায়।"
- "দূর ভয় কিসের? উনি রয়েছেন তো।"
নাপিত বৌ অপাঙ্গে তাকায়, দোতলার দিকে। দাঠাকুরের ক্ষ্যামতা আছে এমন প্রচন্ড রূপসীকে রক্ষে করার? আজ কতদিন হয়ে গেল ঘর ছেড়ে বেরোতেই পারেন না। এদিকে গাঁয়ের সমস্ত শেয়াল কুকুরের দল যে মাংস খাবার জন্য ওৎ পেতে বসে আচে, সে খবর এনাদের কাছে পৌঁছে দিতেও বাধে। আর বৌটাও হয়েচে তেমনি, নিজের রূপ সম্বন্ধে হুঁশটুকু নেই!
আঁধার গাঢ় হতেই রতন মন্ডল মাঠ ডিঙিয়ে পুকুর পেরিয়ে উঠোনের গায়ে বারফটকের আড়ালে এসে বসে। আবছায়া বারান্দা বেয়ে কমললতার যাওয়া আসা দেখা তার নেশা। যত দেখে নেশা তত গাঢ় হয়। ঐ মোহিনী মূর্তীর স্বামীসঙ্গ, আদর সোহাগের কথা ভেবে ভেবে রক্ত চাগিয়ে ওঠে। এ যে কি নিদারুণ কষ্ট।
শেষ পর্যন্ত আকাশ কালিবর্ণ ধারণ করে। কমললতা সিঁড়ি বেয়ে খাবারের থালা সাজিয়ে, প্রকান্ড ঘরটায় ঢোকে। নাকছবিতে ঝিলিক তুলে স্বামীর দিকে কটাক্ষ হানে।
- "আজ ক্ষীর করেছি তোমার জন্য।"
বারফটকের আড়াল ছেড়ে পূব দিকের তেঁতুলগাছের মোটা ডাল, যেটা রঙিন কাঁচের জানলার বাইরে ঝুঁকে আছে, তাতে বসে রতন শিউরে ওঠে। এমন মধুর স্বর!
কমললতা পরম মমতায় এক চামচ ক্ষীর তুলে, টেবিলের সামনে বিলিতি আরামকেদারায় আসীন স্বামীর, শূন্য মুখগহ্বরে প্রবেশ করিয়ে দেয়।
- "সমস্তটা খাও বলছি। ওগো তোমাকে যে সেরে উঠতেই হবে..."
মসলিনের ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত বিকট কঙ্কাল উত্তর দেয়না। করোটির ফাঁক দিয়ে ক্ষীর গলে নীচে পড়ে যায়।
- "এত যত্ন করে রেঁধে আনি, তবু খাবে না গো?"
আদরস্পর্শ পেয়ে তাঁর কশেরুকার হাড়গুলি শুধু খটাখট নড়ে ওঠে। কমললতা সেই মুহূর্তে খাবারের থালা আছড়ে ফেলে মাটিতে। তার সমস্ত দিনদুপুর, সাজসজ্জা, সংসারখেলা মিথ্যে হয়ে যায়।
জানলার দিকে তাকিয়ে কমললতা হাহাকার করে বলে ওঠে - "ওগো আমাকে এখান থেকে যেখানে পারো নিয়ে চলো।"
--------

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন