সন্ধ্যা রায়
আমরা ব্যাঙ্গালোরে থাকি। আমি কর্ণাটকের এক স্কুলে চাকরি করি। ওখান থেকে আমার ট্রান্সফার হয় কর্নাটকের বল্লেরী গ্রামের স্কুলে, আরাধনা কেন্দ্রম। এ যেন আমার শাস্তি হল কিন্তু চাকরি ছাড়ার মত অবস্থা নেই। আমাদের খুব কষ্টের ভিতর চলে। বাবার উপার্জনে আমাদের সবার পড়াশোনা করা খুবই অসুবিধা। তাই আমাকে চাকরী করতেই হবে।
মায়ের চোখের জল বন্ধ হচ্ছে না। একলা মেয়ে আমি, কি করে যাব? কোথায় থাকব? কি করে থাকবো? জায়গা কেমন? সেই সব ভেবে ভেবে অস্থির হচ্ছিলামl আমি সব ভয়-ভ্রান্তি দূর করে বল্লেরীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বল্লেরীর দূরত্ব ব্যাঙ্গালোর থেকে ৩১৫ কিলোমিটার।
সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। পুরটাই বাস জারনি। ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরে ছুটে চলেছে বাসটা। দুপাশে সারি সারি বন-জঙ্গল, মাঝের রাস্তা দিয়ে বাসটা ছুটে চলেছে। মনটা ধুক ধুক করছে। আমার আনন্দ হচ্ছে নতুন জায়গা বলে। ভগবান একমাত্র ভরসা । বাসটা অনেকক্ষণ ছোটার পর হঠাৎ থামল একটা ঢাবার সামনে। সবাই খাওয়া-দাওয়া সেরে উঠে আসলো। আমার সাথে আরও দুজন মহিলা বসে রইলেন। এখানে কিছু লোক নেমে গেল। এদিকের লোকেরা খুব কালো। ড্রাইভার এসে গাড়ি স্টার্ট করল, আবার ছুটছে গাড়ি। এদিকটা বেশ নির্জন, হঠাৎ সামনে একটা ছোট্ট গ্রাম দেখা গেলো। তখন বিকেল চারটে বাজে, বাস থেমে গেল। কন্ডাক্টার চিৎকার করছে, বল্লেরী বল্লেরী--
আমার গ্রাম এসে গেছে, আমি সুটকেস নিয়ে নেমে গেলাম। দেখি সামনে দাঁড়িয়ে একটা কালো লম্বা লোক। বিশালাকায় লোকটার চেহারা। কি যেন বলল ইংরেজি শব্দটি, বুঝলাম আরাধনা কেন্দ্র থেকে এসেছে। প্রধান অধ্যাপিকা পাঠিয়েছে। রাতে দেখলাম চাঁদ উঠেছে কিন্তু রাস্তার দু'ধারে নারকেল গাছ আর সুপারি গাছের ছায়া। আমার খুব ভয় করছিল। এই ছায়াতল থেকে যেতে গা ছমছম করছে। হেঁটে চলেছি পাহাড়ের নিচে দিয়ে। রাঙ্গা চাঁদটা গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে, ওই যেন পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের । কোথাও কোন লোকের সাড়াশব্দ নেই, যাচ্ছি তো যাচ্ছি।
দূর থেকে একটা লোকালয় চোখে পড়ল। বড় একটা সাদা দোতলা বাড়ি। এ ছাড়া ছোট ছোট বেশকিছু ঘর আছে। ওখানে পৌঁছে গেলাম। কালো লোকটা আমার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো, তালা খুলে দিল। তালা খুলে দিয়ে স্যুটকেসটা ভিতর রেখে লোকটা চলে গেলো। এটা আমার ঘর, ভিতরে গিয়ে দেখলাম, একটা খাটিয়া পাতা আছে। তার পাশে টেবিল আর তার উপরে একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। পাশে রয়েছে একটা কাঠের উনুন। একটা পায়খানা-বাথরুম আছে। ঘরটা সিমেন্টের কিন্তু ছাউনি খড়ের। ওই লোকটা আমার সুটকেস দিয়ে চলে যাওয়ার সময় রাতে কিছু খাওয়ার পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইলে ও দুর্বধ্য ভাষায় কিছু বলল, আমি বুঝলাম না। আমার কাছে চিড়া-মুড়ি যা কিছু ছিল খেলাম আর খাটিয়াতে বিছানা পেতে শুয়ে পড়লাম।
সারাদিন বড় ধকল গেছে। শুয়ে পড়ে সারা দিনের কথা ভাবতে থাকলাম। কাল সকালে আশেপাশে কোন ফোন থাকলে ঘরে একটা খবর দিতে হবে, নিরাপদে পৌঁছে গেছি। মোটামুটি সব ভালো আছে। দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কাল জয়নিং রিপোর্ট দিতে হবে। এসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। আবার শব্দ হল, খসখস, যেন কেউ গাছে উঠছে ! মনে পড়ল ঘরে ঢোকার সময় একটা বড় লম্বা গাছ দেখেছি। ঘরের পাশেই লম্বা একটা তাল গাছ ছিল। এবার ভয়ে আমার বুকটা কাঁপছে--মনে হল গাছ থেকে লোকটা আমার ঘরের চালের উপর এসে দাঁড়ালো। আমি ভয়ে দুর্গানাম জপ করতে লাগলাম--দুর্গা দুর্গা দুর্গা। দেখি খড়ের চালের উপর জোরে জোরে খসখস আওয়াজ হচ্ছে। আমি ভয় পাই, চোখটা একটু খুলতেই দেখছি খড়ের চালের মাঝখান থেকে কালো লম্বা দুটো পা ঝুলে আছে। পা দুটো ক্রমশ আমার কাছ পর্যন্ত নেমে আসছে, অনেক লম্বা দুটো পা। আমি চিৎকার করে উঠলাম--মাগো বাবা গো--ব্যাস আর কিছু মনে নেই। তারপর চোখ খুলতেই দেখি অনেকেই আমার চারদিকে দাঁড়িয়ে।
আমি কোথায়? এক জন বললেন, অনেক সময় আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিলাম, তাই হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। দুপুরে বাবা এসে পৌঁছালেন, আমাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এলেন। এবারের মত চাকরিটা আর আমার করা হল না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন