লাল কুঠি
তমা কর্মকার
গরমের ছুটি কলেজ নেই, অনেক দিন আমাদের বন্ধুদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয় না, তাই মনটাও খারাপ বিশেষ করে আজ যখন রাই ফোন করে জানালো তুলির শরীর খারাপ| তুলি রাইয়ের মাসতুতো বোন তুলি রাইদের বাড়ীতে থেকেই কলেজে পড়ে। তুলি আমার প্রিয় বন্ধু | কলেজ ছুটি তাই ও ওদের বাড়ী গেছে| তুলির কোন ফোন নেই। ওর বাড়ীর নিয়ম ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন ফোন দেওয়া হবে না। যাই হোক মাকে তুলির শরীর খারাপের কথা বলে, এক দিনের জন্য তুলিদের বাড়ী মুর্শিদাবাদের লাল কুঠিতে বেড়াতে গেলাম| গিয়ে দেখি মহারানী দিব্বি সুস্থ, আমাকে দেখে তুলি হেসে বলল, কিরে কেমন ঢপ দিয়ে তোকে আনলাম বল? রাগ করিস নি তো? রাগ করিস না, আসলে প্রত্যেক বার তোকে আমাদের বাড়ী লালকুঠিতে আসতে বলি, তুই তো আসতে পারিস না, আর তোর আমাদের বাড়ী লালকুঠি দেখারও খুব শখ | তাছাড়া আমাকে তো বাড়ী থেকে একা কোথাও যেতে দেবে না--
আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর বলতে হবে না, আমারও তোকে দেখতে খুব ইচ্ছা কর ছিল --
সারাটা দিন ওর সাথে গল্পে আড্ডায় খুব ভালো কাটলোl ওর মা নানা রকম রান্না করে খাওয়ালো। ওর মায়ের হাতের রান্না খুব ভালো | সন্ধ্যে বেলা ওর দাদুর ঘরে গেলাম, ওর দাদু আমাদের বসতে বললেন | আমরা বসলাম, তারপর দাদু আমাদের সাথে গল্প করতে লাগলেন। আমি দাদুকে বললাম, দাদু ভুতের গল্প শোনাও--তুলি ভয়ে আমার হাতটা চেপে ধরলো |ওর সারাটা গা কি ভীষণ ঠান্ডা, ঠিক মরা মানুষের গায়ের মতোl
আমি ওকে বললাম, কিরে ভয় পেলি?
তুলি একটু হেসে বলল, ওই আর কি, আমার আবার ভয়| কাল দেখবি তুইই আমায় ভয় পাবি, তার চেয়ে চল আমাদের বাড়ীটা তোকে ঘুরে দেখাই, আজ না দেখলে তোর আর লাল কুঠি দেখাই হবে না--
আমি ওর দিকে হা করে তাকালাম--ওর কথার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝলাম নাl তাই কোন কথা না বলে ওর পেছন পেছন সারা বাড়ীটা ঘুরে দেখলাম। জমিদার বাড়ী তো জমিদারের মতোই বিশাল অট্টালিকা, প্রত্যেকটা ঘর কি সুন্দর করে সাজানো, ঠিক যেন ছবির মত| একটা ঘরে তুলির ছোট বেলার খুব সুন্দর একটা ছবি, ছবিটায় আমার চোখ আটকে গেলো। আমি ছবিটা মন দিয়ে দেখছিলাম। ও বলল, তোর এটা পছন্দ?
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, হ্যাঁ--
তুলি বলল, ছবিটা পেলে আমায় ভুলে যাবি না তো?
আমি বললাম, তাই কখনো হয়?
ও বলল, বেশ তাহলে তোকে ছবিটা দিলাম। সারাজীবন যত্ন করে ছবিটা রাখিস | ছবিটা আমার ভীষণ প্রিয়| আমি ছবিটা ওর থেকে ধরতেই ও যেন হওয়ায় মিলিয়ে গেলো | আমি তুলিকে ডাকতে যাচ্ছিলাম, মা আমাকে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো, কিরে আর কত ঘুমাবি? বেলা দশটা বাজে, রাই এসেছে।
আমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলাম, রাই আমার কাছে এসে কান্নায় ভেঙে পড়লো, আমি বললাম কাঁদছিস কেন?
ও বলল, কাল মুর্শিদাবাদে খুব ঝড় বৃষ্টি হয়েছে, আর তুলিদের বাড়ী লালকুঠির উপর বাজ পড়ে পুরো লালকুঠি ধ্বংস হয়ে গেছে, ওখানে তুলি সহ যারা ছিল সবাই মারা গেছে |
আমি হতভম্ম হয়ে গেলাম, বিছানার উপর তুলির ছোট বেলার ছবিটা দেখে রাই বলল, এটা এখানে কি করে এলো? আমিও কি বলবো, কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না, চুপ করে রইলাম|
আজও বুঝতে পারিনা স্বপ্নে যদি তুলিকে দেখি তবে তুলির ছবিটা কোথা থেকে এলো? লাল কুঠি, সে দিন স্বপ্ন দেখে ছিলাম নাকি সত্যি লাল কুঠি দেখে ছিলাম |

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন