সম্পাদকের কলমে--

সম্পাদকের কলমে--

প্রত্যেক পত্রিকায় সম্পাদক থাকা যেমন অবশ্যম্ভাবী, ঠিক তেমনি সম্পাদকীয় লেখা অনেকটা অনিবার্য হয়ে পড়ে l আমাদের এ বারের সংখ্যা ভৌতিক, অলৌকিক বা পারলৌকিক l

ভয় মানুষকে তাড়িয়ে ফেরে l মানুষ যখন অলৌকিকতার সামনে এসে পড়ে তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, সে হতবাক হয়, বিস্মিত হয় l অলৌকিকতার অজানিত অদ্ভুত ক্রিয়া-কলাপগুলি মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে থাকে, তাকে আতঙ্কিত ও শঙ্কিত করে তোলে। আসলে, প্রত্যেকটি মানুষ মৃত্যু ভয়ে আটকে--মৃত্যু মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ভয় ও রহস্য। আমাদের মস্তিষ্ক নামক যন্ত্রটি জগতের সবচেয়ে উন্নততর একটি যন্ত্র, এখানে তুলনাগত মান ধরলে সমস্ত মানবিক আবিষ্কারের ব্যাপারগুলি ফেল পড়ে যায় l এই ফেল বা অকৃতকার্যতার ফলস্বরূপ উঠে আসে অলৌকিকতা--সে কারণে আজও মানুষ ভূত ভৌতিক প্যারানরমাল ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ । আমাদের সমস্ত জ্ঞান পরিধির সীমানার পর থেকেই সমস্ত অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে l বিজ্ঞানের কার্যকারণ সম্পর্ক সেখানে পূর্ণত অসফল।

মনের পরিচালক হল মস্তিষ্ক l আর মস্তিষ্ক বা ব্রেইন হল অটো জেনারেটর অফ থিংকিং--এটা একটা ডায়নামিক প্রক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া। মস্তিষ্কের কিছু সূক্ষ্ম সেলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকেই হয়ত আমাদের ভূত ভৌতিক প্যারানরমাল অবস্থানগুলির সৃষ্টি। মস্তিষ্কের অণু-পরমাণুর যান্ত্রিক ঘটনাগুলি আমাদের ভুল দর্শনের চিত্রপট হয়ে উঠে আসতেই পারে।

ভাবনা কল্পনা কাহিনী গড়ার জন্য আমাদের মন বড় পটু থাকে । এক শুনলে বা দেখলে তাকে একশ বানিয়ে গল্প করা মানুষের স্বভাব বললে, ভুল হবে না। আরও যেখানে এক জাগায় এসে আমরা ভীত ও অজ্ঞাত সেখানে ভৌতিক বা প্যারানরমাল ব্যাপারে আমরা খুব ভাবি, তাকে আরো অবাস্তব কল্পনা মেখে মনের মাঝে ধরে রাখতে চাই।

কোন মানুষ বা প্রাণী মরলে তাঁর আত্মা মানে অতৃপ্ত আত্মাই নাকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই ভূত ও ভৌতিকতা যখন সাহিত্যাকাশের স্রোতে এসে পড়ে তখন লেখকদের রহস্য-ভাবনা নির্বাধ উড়ে বেড়ায় । মানুষের বুদ্ধির মাপকাঠির শেষ থেকেই তো শুরু হয় রহস্যময়তা, আসল রহস্য সেখানে আরও ঘনীভূত হয়ে পড়ে।

শেষমেষ যদি প্রশ্ন আসে, ভূত বলে কি আদৌ কিছু আছে ? উত্তরে, না, বললে, আমি বলবো ভুল বলছেন। আসলে আপনি এ ব্যাপারে অজ্ঞ। মন বুদ্ধির নাগালের বাইরের ব্যাপারটাই হল অলৌকিকতা। ভগবান, দেবতা, অপদেবতা, এদেরকে বিশ্বাস করতে হলে ভূতকে বিশ্বাস করা যাবে না কেন ? আসলে অলৌকিকতার মধ্য থেকেই উঠে আসে ভুত-প্রেত, আমাদের মানসিক অসুস্থতা বা মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ব্যতিক্রমের মধ্যেও ভুত প্রেত লুকিয়ে থাকতে পারে। এত কিছুর পরেও এই একই প্রশ্ন আমাদের মনে বারবার উঠে আসে--ভূত বলে কি আদৌ কিছু আছে ? কেউ বলেন আছে। কেউ বলেন, নেই, কিন্তু "অলৌকিকতা" ব্যাপারটা যে সত্য, তা নিয়ে আমাদের মনে কোন দ্বিধা নেই। আর আমি বলব, এই অলৌকিকতার মধ্যে থেকেই ভুত-প্রেত উঠে আসে। অনেকের কাছে তা বাস্তবেও প্রকট পায়।

ভূতের ব্যাপারে আমিও এক বিশ্বাসী প্রাণী। আমার কথা কারও বিশ্বাস না হলে আমার তাতে কিছুই আসে যায় না। গল্প হিসেবে ভূতের গল্প পাঠকের উত্তেজনা বাড়ায়, রোমাঞ্চ জাগায়, আসলে রোমাঞ্চিত হওয়ার উপাদান মানুষের মনের মধ্যেই বিদ্যমান।

সে যাই হোক, আসুন বন্ধুরা, পড়ুন আমাদের এবারের ব্লগ ও ই-পত্রিকা। আমাদের বর্তমান সংখ্যার বিভিন্ন ভৌতিক গল্পগুলি পড়ে রোমাঞ্চিত হোন। আবছা অন্ধকার, পোড়ো বাড়ি, ছায়া দর্শন, ফিসফিস কথা, হঠাৎ হওয়ার ঘূর্ণিঝড় সব মিলিয়ে বিচিত্র সব কাহিনীর কথা অঙ্কিত হয়েছে আমাদের বর্তমান ভৌতিক বা প্যারানরমাল সংখ্যায়। শুভকামনান্তে--তাপসকিরণ রায়।

সহ সম্পাদকের কলমে--

এত দিন সম্পাদকের কলমই দেখেছেন আমাদের এই ব্লগের পত্রিকায়। এবং সেটাই স্বাভাবিক। সহকারী হিসেবে এটাই বলবো, আপনারা পত্রিকাটি পড়ুন এবং স্পষ্টভাবে মতামত জানান। কি ভাবে আমরা পত্রিকাকে আরও ভালো করতে পারি। আমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে কি না। আমাদের উদ্দেশ্য আমরা ভালো লেখা হলেই সেটা প্রকাশ করবো। বারবার সম্পাদককে বলতে হবে না আমার লেখাটার কি হল। আমাদের কোন চেনা জানা কাজ করে না। আমার লেখাটা চিনি। তাই আশা রাখি আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং সম্পাদককে পত্রিকা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবেন। ধন্যবাদান্তে--শমিত কর্মকার, সহ-সম্পাদক, বর্ণালোক।

সহ-সম্পাদকের কলমে--

আমাদের নিত্যদিনের চেনা শোনা জগতের বাইরেও যে একটা অজানা অদেখা জগত আছে, একথা অনেকেই বিশ্বাস করেন। অনেকে আবার এসব বিশ্বাস করতে চান না। আছে আর নেই এ বিষয়ে অদ্যাবধি তর্কও বড়ো কম হয়নি। পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসকে দৃঢ় করতেই হোক বা অজানা তথ্য আহরণের জন্যই হোক বসেছেন প্ল্যানচেটে, আবার মজার কথা হল এই যিনি এই ব্যপারে অবিশ্বাস করেন তিনিও তার অবিশ্বাসের ভিত সুদৃঢ় করতে ঐ একই পন্থা নেন।

বিশ্বাস আর অবিশ্বাস যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আবার এটাও ঠিক এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে যার ব্যাখ্যাও যুক্তি বুদ্ধির অতীত।

বর্তমানের নূতন করে প্যারানরমাল বিষয় অর্থাৎ আধি দৈবিক কিংবা আধিভৌতিক বিষয়ে চর্চার জন্য তো রীতিমত আগ্রহ দেখা গেছে। একাংশের মধ্যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক সংগঠনও তৈরি হয়ে গেছে। এবারের অণুগল্পগুলির মধ্যেও এসে পড়েছে সেই অজানা-অদেখা অতীন্দ্রিয় জগতের কিছু কিছু কথা।ধন্যবাদান্তে--সাবিত্রী দাস, সহ-সম্পাদক, বর্ণালোক।

মঙ্গলবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২১

ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়


 

সে কে? 

ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায় 


একা একাই বেড়াতে পছন্দ করে দিবাকর। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে। ভাবুক মন। তাই বেড়ানোর স্থান বাছার ক্ষেত্রেও অন্যের পছন্দের থেকে একটু যে অন্য রকম হবে তাতে আর আশ্চর্য কি? পাহাড় পর্বত বন জঙ্গল সব তার ঘোরা চাই। তবে বড় শহর বা ঘিঞ্জি জনপদ তার পছন্দের তালিকায় নেই। কবি নয় দিবাকর। কিন্তু কবি মন তার। সে এত সুন্দর কবিতা ভাবে বা ভাবে সাহিত্য যা কিন্তু লিখতে গেলেই সব গুলিয়ে যায়। শুধু মনে হয় যা ভেবেছিল তা লিখতে পারল কই? আর যা লিখেছে তা তো ভাবে নি। সেই ভেবে লেখা ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু ভাবনা নিয়েই পড়ে আছে। তার সেই ভাবনাগুলো বন্ধু বা পরিচিতদের যখন শোনায় তখন তারা অবাক হয়ে বলে কেন এইসব তুই লিখিস না দিবাকর?

সেই ভাবনাতেই এমন ফেঁসেছিল যে একটু দূরের আকাশ যে খাদের অনেক গভীরে গিয়ে মিশেছে তা খেয়ালে ছিল না। আকাশের একটা মেঘের সঙ্গে তার মন উড়ে যাচ্ছিল। আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। খাদের প্রায় কিনারায় যে বসেছিল টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।

গড়াতে গড়াতেই খাদের গভীরতা আর খাড়া কিনারার কথা ভাবতেই সমস্ত মন শিউরে উঠল। ভাবনা শূন্য মনে এখন তার শুধুই মৃত্যুর শীতল ছায়া। দু একবার গলা দিয়ে একটা আওয়াজ তোলার ব্যর্থ চেষ্টা হয়ত করে থাকবে। কিন্তু তখনই তার মনে হল তার ধারে কাছে তো একটা মাছিকেও উড়তে দেখে নি সে।

পড়তে পড়তেও সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে দিবাকরের। এরপর আর কিছু হবে না। সে গড়িয়ে চলেছে একটা নিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। যে অন্ধকার থেকে আলোয় আর কেউ ফিরে আসতে পারে না।

নিজেকে একেবারে নিস্তরঙ্গ করে দিয়েছে দিবাকর। আর বাঁচার চেষ্টা করা বৃথা। এবার শুধু অপেক্ষা সেই ক্ষণটার যখন কোনও অনুভূতিই পৌঁছবে না তার কাছে।

কে যেন তাকে টেনে ধরল না? তার শরীরকে পায় নি কিন্তু জামাটা টেনে ধরেছে। তার মানে কেউ আছে আর সেই টেনে ধরেছে। তার মানে আশার হ্রদ এখনও জলশূন্য হয়ে যায় নি। মাটিকে খামচে ধরল দিবাকর। এখানে গাছপালা বিশেষ নেই। যা আছে সেগুলো ছোট ছোট আগাছা।

এই যা তার জামাটা ছেড়ে এল বোধহয় উদ্ধারকারীর হাত থেকে। খানিকটা ছিঁড়ে তার হাতেই রয়ে গেছে নির্ঘাত। তবে আশা সে নিশ্চয় এগিয়ে এসে আবার তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করবে। তাই যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। সে সেই ছোট্ট ছোট্ট আগাছা আর মাটি পাথরের ডেলা খামচে ধরে উঠে আসার চেষ্টা করতে লাগল। তার নিম্নগমন রোধ হল।

এইবার একটু ওপরে তাকানোর ফুরসত হয়েছে দিবাকরের। তার উদ্ধারকারী নিশ্চয় হাত বাড়িয়ে আছে তাকে ধরার জন্যে। আশার রোমাঞ্চের সঙ্গেই সে অনুভব করতে লাগল একটা তীব্র কৌতূহল সে মহান মানুষটিকে দেখার জন্যে যে তার প্রাণ আবার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

ওপরে কেউ নেই। কৌতূহলে আর একটু ওপরে তাকাল দিবাকর। মাত্র ফুট দুয়েক হবে হয়ত গাছটা। ছোট গাছ কিন্তু শক্ত তার ডাল। কয়েকটা শুকনো ডাল খোঁচা হয়ে বেরিয়ে আছে।

তারই একটা শুকনো ডালে তার জামার একটা অংশ ছিঁড়ে এখনও আটকে আছে।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এটি একটি ভৌতিক সংখ্যা

এটি একটি ভৌতিক সংখ্যা