সে কে?
ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়
একা একাই বেড়াতে পছন্দ করে দিবাকর। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে। ভাবুক মন। তাই বেড়ানোর স্থান বাছার ক্ষেত্রেও অন্যের পছন্দের থেকে একটু যে অন্য রকম হবে তাতে আর আশ্চর্য কি? পাহাড় পর্বত বন জঙ্গল সব তার ঘোরা চাই। তবে বড় শহর বা ঘিঞ্জি জনপদ তার পছন্দের তালিকায় নেই। কবি নয় দিবাকর। কিন্তু কবি মন তার। সে এত সুন্দর কবিতা ভাবে বা ভাবে সাহিত্য যা কিন্তু লিখতে গেলেই সব গুলিয়ে যায়। শুধু মনে হয় যা ভেবেছিল তা লিখতে পারল কই? আর যা লিখেছে তা তো ভাবে নি। সেই ভেবে লেখা ছেড়ে দিয়েছে। এখন শুধু ভাবনা নিয়েই পড়ে আছে। তার সেই ভাবনাগুলো বন্ধু বা পরিচিতদের যখন শোনায় তখন তারা অবাক হয়ে বলে কেন এইসব তুই লিখিস না দিবাকর?
সেই ভাবনাতেই এমন ফেঁসেছিল যে একটু দূরের আকাশ যে খাদের অনেক গভীরে গিয়ে মিশেছে তা খেয়ালে ছিল না। আকাশের একটা মেঘের সঙ্গে তার মন উড়ে যাচ্ছিল। আর তাতেই ঘটল বিপত্তি। খাদের প্রায় কিনারায় যে বসেছিল টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
গড়াতে গড়াতেই খাদের গভীরতা আর খাড়া কিনারার কথা ভাবতেই সমস্ত মন শিউরে উঠল। ভাবনা শূন্য মনে এখন তার শুধুই মৃত্যুর শীতল ছায়া। দু একবার গলা দিয়ে একটা আওয়াজ তোলার ব্যর্থ চেষ্টা হয়ত করে থাকবে। কিন্তু তখনই তার মনে হল তার ধারে কাছে তো একটা মাছিকেও উড়তে দেখে নি সে।
পড়তে পড়তেও সারা শরীর অবশ হয়ে আসতে থাকে দিবাকরের। এরপর আর কিছু হবে না। সে গড়িয়ে চলেছে একটা নিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। যে অন্ধকার থেকে আলোয় আর কেউ ফিরে আসতে পারে না।
নিজেকে একেবারে নিস্তরঙ্গ করে দিয়েছে দিবাকর। আর বাঁচার চেষ্টা করা বৃথা। এবার শুধু অপেক্ষা সেই ক্ষণটার যখন কোনও অনুভূতিই পৌঁছবে না তার কাছে।
কে যেন তাকে টেনে ধরল না? তার শরীরকে পায় নি কিন্তু জামাটা টেনে ধরেছে। তার মানে কেউ আছে আর সেই টেনে ধরেছে। তার মানে আশার হ্রদ এখনও জলশূন্য হয়ে যায় নি। মাটিকে খামচে ধরল দিবাকর। এখানে গাছপালা বিশেষ নেই। যা আছে সেগুলো ছোট ছোট আগাছা।
এই যা তার জামাটা ছেড়ে এল বোধহয় উদ্ধারকারীর হাত থেকে। খানিকটা ছিঁড়ে তার হাতেই রয়ে গেছে নির্ঘাত। তবে আশা সে নিশ্চয় এগিয়ে এসে আবার তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করবে। তাই যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। সে সেই ছোট্ট ছোট্ট আগাছা আর মাটি পাথরের ডেলা খামচে ধরে উঠে আসার চেষ্টা করতে লাগল। তার নিম্নগমন রোধ হল।
এইবার একটু ওপরে তাকানোর ফুরসত হয়েছে দিবাকরের। তার উদ্ধারকারী নিশ্চয় হাত বাড়িয়ে আছে তাকে ধরার জন্যে। আশার রোমাঞ্চের সঙ্গেই সে অনুভব করতে লাগল একটা তীব্র কৌতূহল সে মহান মানুষটিকে দেখার জন্যে যে তার প্রাণ আবার তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ওপরে কেউ নেই। কৌতূহলে আর একটু ওপরে তাকাল দিবাকর। মাত্র ফুট দুয়েক হবে হয়ত গাছটা। ছোট গাছ কিন্তু শক্ত তার ডাল। কয়েকটা শুকনো ডাল খোঁচা হয়ে বেরিয়ে আছে।
তারই একটা শুকনো ডালে তার জামার একটা অংশ ছিঁড়ে এখনও আটকে আছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন