হতবাক
শংকর ব্রহ্ম
ফরমাইশি একটা ভূতের গল্প লিখতে হবে বলে লেখার টেবিলে সবে বসেছি। এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠল। বিরক্তি সহকারে উঠলাম। বাড়িতে কেউ নেই। আমাকে বাড়ির পাহারায় রেখে সকলেই গেছে একটা বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে। আমার জন্য ফ্রিজে বিরিয়ানী ও চিলি চিকেন করে রেখে গেছে, রাতে গরম করে নিতে হবে। ওরা সকলে ফিরবে কাল সকালে। দরজা খুলেই বিমূঢ় বিস্ময়ে হতবাক আমি।
দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর আমার পুরণো প্রেমিকা তনয়া দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যার জন্য আমি এক সময় পাগল হয়ে উঠেছিলাম। ভেবে ছিলাম তাকে না পেলে জীবন ব্যর্থ আমার। তা'কে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না, এমনও প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। জোর করে ওর মা বাবা হঠাৎ একদিন ওর বিয়ে দিয়ে দেয় এক স্কুল মাষ্টারের সঙ্গে। আমি তখন কাঠ বেকার।
টিউশনি করে নিজের হাত খরচ চালাই। তখন আমার পক্ষে তনয়াকে বিয়ে করা সম্ভব ছিল না। বিয়ের পরও কিছুদিন চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল ওর সঙ্গে। তখনও মোবাইল বের হয়নি।
একদিন একটা চিঠিতে ইনিয়ে বিনিয়ে কি সব লিখেছিলাম মনে নেই আজ আর। তবে তা'তে দু'টো লাইন লিখেছিলাম মনে আছে আজও।
লাইন দু'টো ছিল -
"খুব বেশী দুঃখ পেলে চলে এসো আমার কাছে, তোমার জন্য বুকে আমার অনেকখানি জায়গা আছে।"
সেই চিঠি লেখা খামখানা পড়েছিল ওর বরের হাতে। তারপর থেকেই ওর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। সম্পর্কের ইতি। প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা।
তারপর এত বছর পর পুনরায় তার দেখা পেয়ে মনটা বিগলিত হয়ে উঠল। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার। চুলগুলো সাদা শনের নুড়ি, অনেকগুলো দাঁত পড়ে গিয়ে, গাল দু'টো চুপসে ভিতরে বসে গেছে। কুৎসিৎ কদাকার রূপ। এর জন্যই আমি এক সময় পাগল হয়েছিলাম, ভেবে অবাক হলাম। তবুও পুরণো প্রেমিকা বলে কথা।
যত্নে আপ্যায়ণ করে ঘরে এনে বসালাম তাকে। আমার জন্য ফ্রিজে রাখা বিরিয়ানী চিলিচিকেন মাইক্রো ওভেনে গরম করে তাকে খেতে দিলাম। তারপর ফ্রিজ থেকে দই মিষ্টি দিলাম। তৃপ্তি করে সে খাওয়ার পর, তাকে বিছানায় ফেলে অপর্যাপ্ত আদর করলাম।
সে খুব খুশি হয়ে ঘন্টাখানেক থাকার পর চলে গেল। যাওযার সময় আমি তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললাম, আবার এসো একদিন।
সে মুচকি হেসে কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেল।
পরদিন সকালে অবনী ( তনয়ার মাসতুত দাদা) ফোন করে জানাল, তনয়া মারা গেছে কাল, হার্ট অ্যাটাকে। অবনী আমার বন্ধু, সেই সূত্রেই তনয়ার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল।
তনয়া ওর মামাতো বোন। আলাপের কিছুদিন পরেই আমরা পরস্পরের প্রেমে পড়ি। বছর খানেক প্রেম চলার পর তনয়ার আচমকা বিয়ে হয়ে যায়।
আমি অবনীর কাছে জানতে চাই, কবে কখন কবে, কখন ঘটনাটা ঘটল?
অবনী বলল, কাল সন্ধ্যা সাতটায়।
আমি তার কথা শুনে হতবাক !
তা কি করে সম্ভব?সেই সময়টাতেই তো তনয়া আমার কাছে এসেছিল কাল। আমি অবনীকে আর কিছু বলতে পারলাম না। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন