চার নম্বর
সোম নাথ বেনিয়া
শীতকালের বিয়ে বাড়ি। বিয়ে বাড়ির ভোজ শেষে ওরা তিন জন ফিরছে। কেউ পান চিবোচ্ছে। কেউ টুথ পিক দিয়ে দাঁতের ফাঁকে খোঁচাচ্ছে। রাস্তা পিচের। রাস্তার উপরে ল্যাম্প-পোস্টের আলো-আঁধারি খেলা চলছে। তিন জনে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একে বাঙালি, মায় ভোজ। সুতরাং ভালোমন্দের আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। কেউ বললো, "মাংসটা কেমন ছেড়ে-ছেড়ে গেছে।" কেউ বললো, "গুড়ের রসগোল্লা করলে পারতো। এই সময় লোকে গুড় খাবে না তো কখন খাবে।" অন্যজন বললো, "খাওয়া-দাওয়া মোটের উপর বাঙালিয়ানায় হয়েছে।" বাড়ির দিকে এইভাবে এগোতে-এগোতে ওরা কখন চার জন হয়ে গেছে কেউ টের পায়নি। তিন জন হঠাৎ খেয়াল করলো ওদের সঙ্গে আরও একজন কেউ হাঁটছে। কিন্তু কে? বাকিরা ওকে চেনেও না, জানেও না। চার নম্বর লোকটি নিজের মতো ওদের পাশাপাশি হাঁটছে। ওরা তিন জন যেন কোনো ধাঁধার মধ্যে পড়ে সম্মোহিত হয়ে তাকে দেখছে। লোকটির হাঁটাচলায় কিছুটা অস্বাভাবিকতার ছাপ আছে। ওদের ভয় করতে শুরু করলো। তিন জনের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটা গা ছমছমে পরিবেশ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ওরা ঠিক করলো মাঝেমধ্যেি আগুপিছু হয়ে হাঁটবে। কখনো-বা ধীরে, কখনো-বা জোরে। দেখা যাক কী হয়! দেখা গেল তারা আস্তে হাঁটলে লোকটাও আস্তে হাঁটে। তারা দ্রুত হাঁটলে লোকটাও দ্রুত হাঁটে। এ তো মহাবিপদ হলো। এক সময় তিন জনে একটি বিষয় নিয়ে একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। সেটা হলো লোকটার শরীর থাকলেও তার কোনো ছায়া নেই। এই ভাবনায় তাদের গায়ের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠলো। শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক ওঠাপড়া ব্যাহত হতে লাগলো। ওরা তিন জন হাত ধরাধরি করে চলেছে। চেষ্টা করছে কোনোরূপ ভয় না পাওয়ার কিন্তু পাশের একজন যদি তেনাদের মতো হয়, তখন ভয় না পেলে চলবে কেমন করে। ওরা তো জানে ওরা রক্ত-মাংসের শরীর। কিন্তু উনি? দেখে তাদের মনে হলেও who'll bell the cat মানে কে বলবে সে ওদের মতো কিংবা ওদের মতো নয়। এই ভাবে হাঁটতে-হাঁটতে তারা ক্লান্তি অনুভব করলো। তাই ওরা ঠিক করলো আর একটু এগোলে যে পার্ক আসবে সেখানে গিয়ে ওরা বিশ্রাম নেবে। হলোও তাই। ওরা সেই পার্কের ভিতর ঢুকে তিন জনে একটা বেঞ্চে বসলো। চার নম্বর লোকটিও ওদের সঙ্গে সেই পার্কের ভিতর ঢুকে একটা দোলনায় বসে দুলতে শুরু করলো। এ তো ভারি মজা ওরফে বিপদ হলো! এক সময় তারা খেয়াল করলো দোলনা দুলছে ঠিকই কিন্তু লোকটিকে একবার দেখা যাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার দেখা যাচ্ছে না। এইবার তো বিষয়টাকে ওদের কাছে ভয়ানক ভৌতিক কাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। তাই আর বিলম্ব না করে ওরা তিন জন বাড়ির দিকে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে শুরু করলো। ওদের মনে হলো সেই লোকটিও ওদের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে আর বলছে, "এত ভয় পেলে হবে। সবাইকে একদিন মরতে হবে!"
(লেখাটি সম্পূর্ণরূপে মৌলিক এবং অপ্রকাশ)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন