জয়ী ভালোবাসা--
কাবেরী তালুকদার
ও হো, আপনি এসে গেছেন ? ঠিক আছে একটু বসুন, আমি নাইট সিফপ্টের, এটাই মনে হয় শেষ, সাইকেল রেখে আসছি।হ্যা, এবার বলুন ভাই।তবে যা দেখতে এসেছেন, ভয় পেলে কিন্ত চলবে না। কি বললেন, আমার ভয় করে কি না?
না ভাই আমার ভয় করে না।আসলে অনেক দিন ধরে ঘটে চলেছে তো ঘটনাটা, তাই আর ভয় করে না। এ কি, না না সিগারেট খাবেন না এখানে। আর ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ওরা এসে যাবে। দাড়ান, ওদের সাইকেল দুটো বাইরে রেখে আসি। একটু ঐ বিছানায় গড়িয়ে নিন না। খাবেন কিছু? ও খেয়ে এসেছেন। চুপ, ওরা আসছে। শুনতে পাচ্ছেন ফিসফিস করে কথা, হাসির শব্দ? একদম চুপ। দরজার ফাক দিয়ে দেখুন যা দেখতে এসেছেন। একটি ছেলে ও চুড়িদার পড়া একটি মেয়ের ছায়া ছায়া অবয়ব এগিয়ে এলো। প্রথমে মেয়েটি সাইকেলটা নিয়ে বেল বাজালো। অনুরনন। জাহাজের ঘন্টা ধ্বনী। এবার ছেলেটি তার সাইকেল নিয়ে বেল বাজালো। যেন ফোনের রীঙ টোন।
অল্প হাসির আওয়াজ। দুজনে সাইকেল নিয়ে ভ্যানিস। দেখলেন ভাই? আমি উঠতে চাইছিলাম। মহিলা বললেন, শুরুটা যখন দেখলেন, শেষটাও দেখে যান। দু ঘন্টার মধ্যে ওরা ফিরে আসবে। ইতিমধ্যে শুনে নিন ওরা কারা। মহিলা দু কাপ চা বানিয়ে এক কাপ আমাকে দিলেন ,আর নিজে নিলেন। বলতে শুরু করলেন, প্রায় ছশ বছর আগে আমি এখানে সাইকেল গ্যারেজ করি। দেখছেন তো মধ্যে মাঠ আর দু পাশে দুটি ছেলে ও মেয়েদের হাই স্কুল। প্রথম সাইকেল রাখতে এলো রীতা ও সুমন। ওরা আরো ছাত্রছাত্রীদের জুটিয়ে আনলো। বেশ দাঁড়িয়ে গেলো আমার গ্যারেজ। দুজনেই ইলেভেনে পড়ে। সুমন পাতি বাঙালি। রীতারা মারোয়ারী। তবে না বলে দিলে বোঝা যায় না। আমার মনে হয়েছিল ওরা পরস্পরকে ভালোবাসে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলছিল এ প্রেম বিরাট অশান্তি ডেকে আনবে। সুমনের মা মিউনিসিপ্যালিটিতে পিয়নের কাজ করেন। বাবা নেই। রীতারা বনেদি ব্যাবসায়ী। ভেবেছিলাম যা, ঘটলো তাই। কি করে জানাজানি হল কে জানে। এক দিন ভোর বেলা সুমনের রক্তাক্ত মৃতদেহ পাওয়া গেলো গঙ্গার ঘাটে। পুলিশ নিষ্ক্রিয়। এর দিন সাতেক পরে উদভ্রান্ত রীতা এসে সাইকেল জমা রেখে গেলো। পরদিন সকালে রীতাকে পাওয়া গেলো দ্বীখন্ডিত রেল লাইনে। পুলিশ আর কি করবে। রীতা লিখে রেখে গিয়েছিল, ওর মৃত্যুর জন্যে,,,,,।
এর ঘটনা সংক্ষিপ্ত ।
সুমনের মা এসে রীতার সাইকেলের উপর সুমনের সাইকেলটা রেখে যান। ওদের ঐ সাইকেরলের অন্য রকম ধ্বনিই বুঝিয়ে দিতো ওরা আলাদা অন্যদের থেকে। ওরা দুজনে মিলে এক। এরপর ঐ জায়গাতেই পড়ে থাকতো সাইকেল দুটো। প্রায় বছর খানেক বাদে রাত বারোটা নাগাদ প্রবল অনুরনন। ওপর থেকে জানলা দিয়ে দেখে ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। তারপর রোজই একই সময় ওরা আসে । সাইকেল নিয়ে চলে যায়। আর দুঘন্টা পরে ফিরে এসে সাইকেল রেখে যায়। এখন আর ভয় লাগে না। ছেলে মেয়েরা আমাকে নিয়ে যেতে চায়। যেতে পারি না। এই ভাঙা বাড়ি আগলে সাপ শিয়ালের সঙ্গে বাস করি ওদের জন্যে। ওরা জানে এক জন অন্ততঃ ওদের ভালোবাসার স্বীকৃতি দিয়ে চলেছে। ওরা আসছে । লাইটটা নিভিয়ে দিন ভাই।
সমাপ্ত
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন