এটা কি ছিলো ?
ঊশ্রী মন্ডল
আমি তখন দিল্লিতে, তিন তলায় খোলা একটা ঘরে স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে ভাড়ায় থাকতাম l পাশের বাড়ির পলি বলল, 'দিদি, হরিয়ার দাদি আজ ভোরে মারা গেলেন l মনটা খারাপ হয়ে গেলো, রোজ যখন ছেলেকে স্কুলে দিতে যেতাম, তখন উনি খুব কথা বলতেন, খুব ভালোবাসতেন গুড্ডুকে l বেরোলাম ছেলেকে নিয়ে স্কুলে দিতে, দেখি হরিয়াদের বাড়ির সামনে বেশ ভিড় l পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম ভিড় ঠেলে, দূর থেকে দেখলাম ওনাকে, প্রণাম জানিয়ে ওনার আত্মার শান্তির কামনা করলাম l তারপর ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে, ঘরে ফিরে ওনার কথাই মনে করছিলাম l হঠাৎ ফোন এলো ছেলের স্কুল থেকে, গুড্ডু অসুস্থ হয়ে পরেছে l আমি সব ফেলে ছুটলাম স্কুলের উদ্দেশ্যে l গিয়ে দেখি গায়ে খুব জ্বর, চোখটা টকটকে লাল , আমি তক্ষনাৎ ছেলেকে নিয়ে গেলাম ডাক্তারখানায় l ঔষধপত্র নিয়ে নিয়ম মত খাওয়াতে লাগলাম l গুড্ডু ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলো l
সেই দিন হঠাৎ দেখি ও আপন মনে কি যেন বকবক করছে, আমি জিজ্ঞাসা করলে কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে না, গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম বেশ জ্বর, আমাকে একদম সহ্য করতে পারছে না, আমার কাছে থাকতেই চাইছে না l
পলি বললো, ' দিদি আমার কাছে কালীমায়ের জলপোড়া আছে একটু খাইয়ে দেবেন ? মনে হয় উপরে হাওয়া লেগেছে '|
আমি বললাম, ' বেশ খাইয়ে দাও ' l
পলি যেই খাওয়ালো, একটু পরেই ও সুস্থ হয়ে উঠলো l পলি এও বললো, পাশের গলিতে একজন ওঝা থাকেন, ওনার কাছ থেকে অবশ্যই যেন ঝাড়িয়ে আনি l আমার স্বামী কিংবা আমি কেউ এই সব বিশ্বাস করতাম না, তবুও নিমরাজী হয়ে ছেলেকে নিয়ে ঐ ওঝার কাছে উপস্থিত হলাম, উনি যথারীতি ঝাড়ফোঁক করে একটা ধাগা হাতে বেঁধে দিলেন আর বললেন, ' এই ধাগা তিন মাস অবশ্যই যেন ওর হাতে থাকে, কোনো মতেই যেন না খোলে ' l
একদিন ভীষণ গরম পড়াতে বাইরে বিছানা করে শুলাম , হাল্কা হাওয়া বইছিলো, দূর আকাশের তারারাও আমাদের মিটমিট করে দেখছিলোl গুড্ডুর সাথে বকরবকর করতে করতে গায়ে একটা হাত রেখে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না l হঠাৎ আমার হাত কে যেন এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো, চমকে উঠে দেখি গুড্ডু আমার দিকে রাগত অবস্থায় তাকিয়ে আছে, চোখ লাল হয়ে গেছে l বলছে, ' কেন আমার গায়ে হাত দিয়েছিস ? ' বলে সে তার বাবার কাছে চলে গেলো, গায়ে হাত দিয়ে দেখি বেশ জ্বর l তাড়াতাড়ি হাতের দিকে দেখলাম, দেখি ধাগাটা নেই, ছিঁড়ে পড়ে আছে l ভয়ে আতঙ্কে ঐ রাতেই ওঝার কাছে ছেলেকে নিয়ে চললাম l
তিনি সব শুনে বললেন, আমি আবারও মায়ের কাছে তোমার সন্তানের মঙ্গল কামনায় পূজা করবো l মদসহ আনুষঙ্গিক আরো কিছু কিনে আনার নির্দেশ দিলেন l আমরা আবার সব কিনে নিয়ে ওনার কাছে গিয়ে পূজায় বসলাম l সব শেষে উনি আমার ছেলের হাতে মন্ত্রপূতঃ ফুল দিয়ে একটা তাবিজ বেঁধে দিয়ে বললেন কোনো মতেই যেন এই তাবিজ যেন ওর হাত থেকে না পড়ে l এরপর থেকে যতই গরম পড়ুক না কেন, আমরা আর বাইরে শুই নি l
আজ আমার ছেলের বয়স ২৫ বছর হয়ে গেলো, আজও আমি ছেলেকে কোনো মৃতদেহের সামনে যেতে দিই না l আচ্ছা এই বিজ্ঞানের যুগে আজও এই সবের অস্তিত্ব আছে ? যা আমি কোনো দিন বিশ্বাস করতাম না তা আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি ! এ কি ছিলো আপনারাই বলুন না l

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন