নানাহার পুকুর
কৌস্তুভ দে সরকার
গেছিলাম খগেন দা-দের গ্রামের বাড়ি, অলিহানগরে। ওর মা বোগিয়া পিঠা বানিয়েছে। সেই লোভে, খেতে। এই পিঠেটা গ্রামীণ রাজবংশী সমাজের ঐতিহ্য। পিঠেটা সম্পর্কে অন্য কোনোদিন বিস্তারিত জানাবো। আজ শুধু নামটা জানিয়ে রাখলাম। সেদিন ছিল শীতের বিকেল। স্কুল থেকে ফিরে বইখাতা রেখে হাত পা ধুয়ে সামান্য কিছু খেয়েই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মাকে বললাম, মা, সাইকেল চালাতে যাচ্ছি।
তখন আমি হাফপ্যান্ট, সবে হাফ প্যাটেল। কাজেই পুরোপুরি সিটে বসে সাইকেল চালানো শিখতে গেলে একটু প্র্যাকটিস তো করতে দিতেই হবে। তাই সাইকেল চালানোয় ছাড় ছিল। বাড়িতে সাইকেল ফাঁকা পরে থাকলেই চালানোর আগ্রহ ও সুযোগ বেড়ে যেত এবং তার সদ্ব্যবহারও করে নিতাম। মা বললো, বেশিদূর যাস না। আমি বললাম, না, এই তো ব্লকের মাঠে। আর বড় জোর খগেন দা-দের বাড়ি যেতে পারি। খগেন দার আমাদের বাড়িতে খুব যাতায়াত ছিল। ওরা এখানে হোস্টেলে থাকতো। বাপু মানে আমার বাবার কাছে টিউশনি পড়ত। দাদারও বন্ধু ছিল। আর বাপু যেহেতু ওদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক, তাই পরীক্ষার খাতায় বাংলায় কত পেল সেই খবর আগাম জেনে যাবার জন্যে আমাকে হাতে রাখার চেষ্টা করত। আমিও কম না , খিদে পেলেই ওদের হোস্টেলে গিয়ে এক থাল মুড়ি খেয়ে চলে আসতাম। বলতে দ্বিধা নেই, খগেন দা আমাকে ভালোবাসতো আর খাওয়াতোও খুব। তা সেই খগেন দা –আলিহানগর যেতে প্রায় আধ ঘন্টা লেগে গেল।
আমাদের বাড়িরগলি দিয়ে বেরিয়ে পাড়ার রাস্তা ধরে সোজা প্রথমে বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড পেরোলেই সোজা রাস্তা চলে গেলে গেছে করণদিঘির সুপার মার্কেট ধরে দাতা কর্ণ রোড হয়ে মেলা এলাকায় নানাহার পুকুরের পাশ দিয়ে অনেকটা গিয়ে আলিহানগর। আগেই বলে রাখি, এই নানাহার পুকুরের জলের রং টা কালো। দেখলেই মনে হয় মাঝে খুব গভীর এই পুকুর। পুকুরের এক পাড় মানেই এই আলিহানগর যাবার রাস্তা।
পালেরা এই পুকুরের মালিক। বোধহয় রবি পালের পুকুর এটা। এলাকায় রবি কাকা নামেই তিনি বিখ্যাত। যেমন দরাজ গলা, তেমনি তার উদার মন। আর মানুষের সাথে মিলেমিশে হেসে খেলে গল্প করে দেদারে সময় কাটাতে ভালোবাসেন দিলদার এই মানুষটি। পুকুরে মাছের খাবার দিতে দিতেই পুকুরের জল এত কালো কিনা আমার জানা নেই। তবে এই পুকুরটি কেন যেন দেখলেই মনে হয় একটু ভিন্ন জাতের। এর বিশাল ব্যাপ্তি দেখলেই কেন যেন ভয় ভয় করে। গভীর রাতে এর পাড়ে একলা এলে কারো যে গা ছমছম করবে না, সেকথা জোর গলায় কেউই বলতে পারবে না বোধহয়।
বিকেলে সেই পুকুর সংলগ্ন এলাকা তো অবলীলায় সাইকেল চালিয়ে পার হয়ে গেলাম। কিন্তু ফেরার সময়ই ঘটলো যত বিপত্তি। খগেন দা-দের বাড়িতে গিয়ে বগিয়া, মোয়া, মাছের ঝোল, রসগোল্লা এসব মস্তি করে খেতে খেতে কখন যে পশ্চিম পাড়ে সূর্য হেলে গিয়ে উধাও হয়েছে টের পাইনি। অগত্যা সন্ধ্যার হিম আবছায়ায় সাইকেল চেপে বাড়িমুখো হলাম সাহসে বুক বেঁধেই। কিন্তু, নানাহার পুকুরের কাছে এসেই ঘটল যত বিপত্তি। ঠিক যেখান থেকে পুকুরের শুরু হয়েছে ঠিক সেখানে পৌঁছেই আমার সাইকেলের চেনটা পড়ে গেল। কি মুশকিল। একে তো অন্ধকার হয়ে এসেছে, তার উপরে কাছে দূরে কাউকেই চোখে পড়ছে না। রাস্তার পাশের প্রকান্ড বটগাছের নিচে অসহায় আমি সাইকেলের চেন তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেন যেন চেনটা কিছুতেই তোলা যাচ্ছে না। এদিক তুলি তো ওদিক পড়ে যায়। বেশ কয়েকবার এরকম করতে করতে শেষে শীতের মধ্যেও আমার ঘাম ছুটে গেল। ক্রমে হাত পা কাঁপার সঙ্গে বুকটাও দুরুদুরু করতে লাগলো। ঠিক এইখানে এরকম হল কেন? চেনটা কি এখানেই পড়তে হত? অন্ধকারে একপাশে পুকুরের জলের মৃদু আলোড়নের শব্দের সাথে পুকুর পাড়ের ও বটগাছের ভেতর থেকে নানা প্রজাতির পোকামাকড়ের একটানা ডেকে চলার সাথে পুকুরের জলের উপর দিয়ে বয়ে আসা হাল্কা হিমেল বাতাস ধীরে ধীরে যেন রোমাঞ্চকর সন্ধ্যার এই নিঃসঙ্গ নিঝুম নিস্তব্ধতার পিঠের লোমগুলো খাড়া করে দিয়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষন চেষ্টার পর বাবা লোকনাথের নাম নিয়ে সাইকেলের চেনটা উঠিয়ে নিতে পারলাম। ততক্ষনে পুরো কালিময় হয়ে গেছে দুইহাত। ওদিকে না তাকিয়ে এবার সাইকেলে চড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কি অবাক কান্ড। সিটে উঠতে গিয়েই পড়ে গেলাম। তিন চার বার এরকম হল। মনে হচ্ছিল যেন কোন এক অমোঘ শক্তি আমাকে বারবার সিট থেকে নামিয়ে দিচ্ছে, টেনে ধরছে আমার হাত পা, আমাকে কিছুতেই সাইকেলের সিটে বসে সাইকেল চালিয়ে আসতে দিচ্ছে না। যেন সাইকেলে উঠলেই আমার কোনো একটা বিপদ ঘটে যাবে। এখন উপায়? আর কি আশ্চর্য, অন্য সময় কত লোকজন যায় রাস্তা দিয়ে, কত সাইকেল, মোটরবাইক, গরুগাড়ি, ভ্যান রিকশা। আর আজ সব কোথায় হাপিস হল। কারুরই কি এই মুহূর্তে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের বালাই নেই? ভাবতে ভাবতেই এই অনাহুত আতঙ্ক ও আশঙ্কার ঘেরাটোপে আটকে যাচ্ছিলাম যেন। শেষে বাবা লোকনাথের নাম নিয়ে বুকের মধ্যে কিভাবে যেন প্রচন্ড সাহস জমা হয়ে গেল আর "ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষন সাথে আছে ভয়টা আবার কি?" এই ছড়াটি জোরে জোরে বলতে বলতে একপ্রকার সাইকেলটাকে দৌড়িয়ে নিয়ে ওই পুকুর সংলগ্ন এলাকা পার হবার সিদ্ধান্ত নিলাম। পুকুরটা পার করে আবার কি করে অবলীলায় সাইকেলে উঠে বাকি রাস্তা চালিয়ে চলে এলাম, ভাবতে আজো অবাক হয়ে যাই।
পুকুরের ওখানে আমার সাথে ঠিক কি কি ঘটনা ঘটেছিল বা কেন ওরকম হয়েছিল, সেকথা কিন্তু আজো সেভাবে কাউকে বলি নাই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন