(কিছু
কথা- অতিলৌকিক কাহিনী আগে লিখিনি,তাই লিখতে গিয়ে প্রথমটায় অনুবাদ করার কথাই মনে
হল।একেবারে আক্ষরিক অনুবাদ নাম/স্থান/কাল/পাত্র সমেত। শ্রেয়া কৌশিক ইংরেজিতেই
প্যারানর্মাল বিষয়ক গল্প লেখেন। এই কাহিনীটি তেমনই একটি।)
হাঙ্গেরিয়ান ডল
**************
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
"আবার সে এসেছে ফিরিয়া" একমুখ হাসি আর উল্লাস নিয়ে আলিয়া অবশেষে দিদির বাড়ির দরজা খুলে সে হইহই করে ঢোকে। অনিতা তখন ওপেন কিচেনে টুকিটাকি কাজের ফাঁকে ব্যস্ত। তার স্বামী আপাতত দশদিনে লম্বা অফিস ট্যুরে দিল্লীতে।আদরের বোনটিকে দেখে সব ছেড়েছুড়ে সে এগিয়ে আসে। পাগলী বোনটার মাথার চুল গুলো ঘেঁটে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করে ' তোর এবারের হাঙ্গেরীর ট্রিপটা কেমন হল রে ?' 'আগে কফি খাওয়া প্লিজ ' সোফায় গা এলাতে এলাতে আলিয়া বলে।
" ক্যাসেলস্ ওয়্যার স্টানিং দিদি" ! দেশ বিদেশে গিয়ে গিয়ে ফ্রিলান্সিং ফোটোগ্রাফি করার পর সম্প্রতি একটা নামী ইংরেজি ম্যাগাজিনে চাকরি পেয়েছে সে। তারই সুবাদে এবারে ওর এই ট্যুরটা। এজন্য ওকে জিজু 'জিপসি' বলে ডাকে। আলিয়া বলে হঠাৎ করে আলেকজান্দ্রিয়া যেতে হল আর ওখান থেকে গ্রীস হয়ে হাঙ্গেরী। কনটিনেন্টের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। বিহাইন্ড দ্য লেন্সে সেটা আরো ভাল ভাবে বোঝা যায়।
মুম্বাইতে দিদির বোরিভেলীর বাড়িটা ওর হোমকামিং এর মতোই। বাড়তি আকর্ষণ 'আয়েষা ' একমাত্র বোনঝিটা সবে ছবছরে পড়েছে।খুব কিউট দেখতে হয়েছে এখনই।
ব্যাগ থেকে একটা রঙচঙে মোড়ক বের করে আয়েষার সামনে গিয়ে দোলায় আলিয়া। ছোট্ট আয়েষা ঝপাত করে সেটা নিয়েই দৌড় লাগায় পরক্ষণে। অনিতা বলে "তোর আবার অত কি উপহার আনার আছে বলতো ! এই তো সেবার অত্তকিছু আনলি! খালি পয়সা নষ্ট করা " আয়েষা ততোক্ষণে মোড়ক খুলে পুতুলটা বের করে আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে। কি সুন্দর একটা ডল্ এনেছ মাসিমণি!
দিদির উদ্দেশ্যে প্লাককরা ভুরুজোড়া কুঁচকে আলিয়া ধমক লাগায়- 'থাম তো দিদি! এই বয়সে পুতুল খেলবে না তো কখন খেলবে, যত্তসব !'
'মাসিমণি দেখো দেখো ! পুতুল টা কি রাগী!' আয়েষার ডাকে চটকাটা ভাঙে। জেটল্যাগ এখনো কাটেনি। একটু চোখে চোখ লেগে গেছিল। ওর মনে পড়ে গেল ওটা কেনবার সময় কিউরিও শপের দোকানীটা কি অদ্ভূত চোখে ওকে দেখছিল।শেষে থাকতে না পেরে বলেই ফেলল ' আপনি নিশ্চয় আর্ট কালেক্টর?' 'কেন বলুন তো? আমি এটা আমার বোনঝির জন্য নিচ্ছিলাম আসলে ' আলিয়া অবাক হয়ে উত্তর দেয়। 'কত বড় সে' আবার প্রশ্ন করে দোকানীটি। 'ছ বছর ! কেন?' আলিয়ার উত্তরে হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় সে বিড়বিড় করে কি সব বলে। শেষটুকু শুধু বুঝতে পারল যে দোকানীটা বলছে "এটা এভাবে বোধহয় না নিলেই ভালো করতেন ! " ততক্ষণে আলিয়া কিউরিও স্টোরটা থেকে বেরিয়ে বাস স্টপের দিকে পা বাড়িয়েছে।
পরদিন সকালটা বেশ মেঘলা। অনিতা বেডরুম থেকে বেরোতেই আলিয়া বলল 'আয়েষা উঠেছে?" " না রে, সারারাত ভাল করে ঘুমোয় নি বেচারা। খালি ছটফট্ করেছে আর বলছে পুতুলটা নাকি ওকে বকেছে আর মেরে ফেলবে বলেছে! " অনিতা বলে সবসময় রূপকথার জগতে আছে ও। সেদিন বলে ওর টেডিটা নাকি ওকে চা খাওয়াতে চাইছে ! ভাব একবার ! " দিদির কথাটা কিন্তু সহজভাবে মেনে নিতে অসুবিধা হয় আলিয়ার। তাহলে কি...?
একটুপর আয়েষা উঠলে ওকেই জিজ্ঞাসা করে ও কি হয়েছে সোনা ঘুমু হয়নি তোমার? আয়েষা বলে ওকে নাকি সারারাত খালি চোখ পাকিয়ে এলিজাবেথ 'মেরে ফেলবে! মেরে ফেলবে' বলে বকেছে আর ভয় দেখিয়েছে ! এলিজাবেথ নাকি ওই পুতুলটার নাম। " কিরে আমি কি ওটা ফেরত নিয়ে যাব?" আলিয়াকে কথা শেষ করতে দেয় না আয়েষা। ঘ্যানঘ্যানে সুরে বলতে থাকে ' না ! না ! ও কোত্থাও যাবেনা ! ও আমার কাছেই থাকতে চায় ! ' কেমন একটা গম্ভীর অদ্ভূত গলায় আয়েষা জবাব দেয়।
দুপুরেও একইভাবে আয়েষার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। অনিতা বলে 'ওই এক কথাই ঘুরেফিরে বলছে। কি জানি বাবা ! দিব্যি মিষ্টি পুতুল। ভ্রূ গুলো একটু টানা টানা বলে দেখলে মনে হয় যেন রেগে আছে ! কি সুন্দর ড্রেসটা আবার। আলিয়া প্রথমবার দেখে জামার পিঠের কাছে এমব্রডায়রি করে ' E B' ইনিশিয়াল করা আছে ছোট্ট করে।
আলিয়া ল্যাপটপে ' হাঙ্গরীয়ান ক্রেস্ট' সার্চ করতে বসে পড়ে। খুঁজতে খুঁজতে সে হঠাৎই পেয়ে যায় ' ন্যাডেস্ডি ফ্যামেলী ক্রেস্ট ' যেটা পুতুলটার জামার পিছনে করা ইনিশিয়ালটার সাথে হরফে হুবহু মিল আছে। এখন যেন উত্তেজনায় নিজের হার্টবিটটা শুনতে পাচ্ছে আলিয়া। গুগলের পাতায় লেখাগুলো ভেসে আসে এক এক করে; "
এলিজাবেথ বাথ্রয়,কাউন্টেস, ন্যাডেস্ডি, নীচে একজন যুবতী ও সুন্দরী হাঙ্গেরিয়ান কাউন্টেসের ছবি । ছবিটার নীচে লেখা আছে অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির ও রাগী চোখের এই কাউন্টেস আসলে ছিলেন ষোড়শ শতকের এক ঘৃণ্য সিরিয়াল কিলার। নিজের রূপের গরিমা তিনি সদাই ব্যস্ত থাকতেন। ব্যাপারটা শেষে এমন একটা পর্যায়ে চলে যায় যে একবার তাঁর এক পরিচারিকার ওপর রাগ করে তার মাথায় এমন সজোরে আঘাত করেন তিনি যে সেই পরিচারিকাটি গুরুতর আহত হয় এবং তার শরীর থেকে বেরনো রক্তের ছিটে কাউন্টেসের গায়ে এসে লাগে।
কাউন্টেস তখন উপলব্ধি করেন নররক্তের লালিমায় তাঁর স্কিনে আরও জৌলুস ফিরে এসেছে। তারপরই শুরু হয় নিয়মিত ভাবে দশ থেকে বারো বছরের বাচ্চা মেয়েদের গোপনে হত্যা আর তাদের শোণিতধারায় রূপচর্চা। এমনকি কখনো কখনো তা পানও করতেন সেই কাউন্টেস। কাউন্ট একদিন সব জানতে পেরে ক্যাসলের ভিতরেই একটা ছোট ঘরে ওকে বন্দী করে রাখেন। নির্বাসিত কাউন্টেস যে কদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন একটা করে কাপড়ের পুতুল সেলাই করে রাখতেন। সেই মিষ্টি সুন্দর হাঙ্গেরিয়ান পুতুলগুলির ঠোঁটে হাসির বদলে এঁকে দিতেন ঘৃণা আর আর পুতুলগুলির জামার পিছনে এমব্রয়ডারি করে দিতেন নিজের নামের আদ্যক্ষর 'E B '। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি বলে যান তাঁর এই হত্যালীলা চলবেই,কোনওদিন বন্ধ হবার নয়।ক্যাসেলের ভিতরে কাউন্টেসের একদিন রহস্যজনক মৃত্যুর পর ওই পুতুলগুলিতে তাঁর অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও প্রবিষ্ট হয়ে এই রকম শোণিতপিপাসী হত্যালীলা চালিয়েছে এই সেদিন অবধিও।
আলিয়া এবার বুঝতে পারে কেন সেদিন দোকানী এটা সহজে বিক্রী করতে চাইছিল না। একদৌড়ে ছুটে এসে দিদির বেডরুমে ধাক্কা লাগায় খুব জোরে।
কিন্তু ততক্ষণে সর্বনাশের আর বাকি থাকেনা। ওই প্রেতাবিষ্ট পুতুলটির পাশে পড়ে থাকা আয়েষার নিস্পন্দ দেহটাকে বিছানার ওপর দেখতে পায় সে। জানলা দিয়ে মেঘছেঁড়া আলোয় ফ্যাকাশে রঙের আয়েষার রক্তশূন্য ছোট্ট দেহটা থেকে কেউ যেন সমস্ত রক্ত নিমেষে শুষে নিয়েছে এক লহমায়। ঘাড়ের পাশে লম্বা একটা কাটা দাগ, রক্তরেখা শুকিয়ে সেখানে কালচে রঙ ধরেছে। দু হাতে নিজের দু চোখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে।
পুতুলটাকে সবেগে উঠিয়ে তা জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে
দেবার সময় সে দেখতে পায় হাঙ্গেরিয়ান কাউন্টেসের বানানো সাড়ে চারশো বছর আগেকার
পুতুলটির ঠোঁটটি লালচে হয়ে আছে রক্তবিন্দুর নির্মম লাল রঙে।
( মূল
কাহিনী : The
Hungarian Doll- Shreya Kaushik ভাষান্তর: শ্যামাপ্রসাদ সরকার)

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন