ভূতাণু : সহযাত্রী
মিত্রাণী আদক
ডেলি প্যাসেঞ্জারির কারণে বাসের মধ্যেই আমাদের ডেলি প্যাসেঞ্জারদের একটা ছোট দল তৈরি হয়েছে। আমরা সাধারণত একসাথেই যাওয়ার আর ফেরত আসার বাস ধরি। বাদামতলা থেকে বাবুঘাট, দেড় ঘন্টার জার্নি।অতএব নিজেদের মধ্যে আড্ডা তাসখেলা,গানের লড়াই থেকে গ্যাঁজানো সবই চলে। অন্যান্য প্যাসেঞ্জাররা বিরক্ত হলেও আমরা পাত্তা দিইনা। চেনামুখ বলে বাস কন্ডাক্টরাও আমাদের বিশেষ ঘাঁটায় না,বছরে আমাদের একটা পারিবারিক পিকনিক আর একসাথে মুভি দেখাও বাদ যায় না। ভালোই আছি। আমাদের দলের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য সনাতন দা আর কচি সদস্য কবি।স্বল্পভাষী সনাতন দা খুব কাজের লোক আমাদের সব প্রোগ্রামের উনিই অর্গানাইজার।কারো কোনো প্রব্লেমে উনিই সহায়,আর কবি অত্যন্ত বাচাল প্রকৃতির, সব কাজ ভন্ডুল করতে ওস্তাদ।দুজনের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় একসাথেই যাতায়াত।আর মজার কথা স্বভাবে ও বয়সে প্রচুর তফাৎ হওয়া সত্ত্বেও দুটিতে বেশ ভাব।
সেদিন কোন একটা পাবলিক হলিডে ছিল। যতদুর সম্ভব মনে পড়ছে গুড ফ্রাইডে।শনিবার অনেকেরই ছুটি। তাই বাস বেশ ফাঁকা আর আমাদের টিমেও অনুপস্থিতির হার চোখে পড়ার মত।বাস ছাড়ার মুখে দেখি ছুটতে ছুটতে কবি আসছে। চেনা কনডাক্টর দেখতে পেয়ে তুলে নিল।বেচারা এমনভাবে দৌড়ে এসেছে যে হাঁপাচ্ছে। বন্দনাদি তাড়াতাড়ি ওনার জলের বোতলটা এগিয়ে দিলেন,ঢকঢক করে বেশ খানিক্টা জল খেয়ে সুদামের ছেড়ে দেওয়া জানলার ধারের সীটে হেলান দিয়ে ধাতস্থ হল ছেলেটা। বাস চলছে, লোক ঊঠছে নামছে। আমাদের অনেকেই আজ আসেনি বলে আড্ডাটা ঠিক জমছে না।
- "হ্যাঁরে কবি আজ সনাতন দা আসেন নি কেন রে? উনি তো জিপিও তে আছেন। আজ তো ছুটি নয়।"
- "জানি না তো। আমি তো দেরিতে বেরিয়েছি বলে ভাবলাম কাকু একাই চলে এসেছে হয়ত।"
- "আজ এত চুপচাপ কেন রে তুই? ঝাড় খেয়েছিস কোথাও?"
- "রিমির সাথে ব্রেক আপ হয়ে গেছে?" সায়ন্তন ফুট কাটলো।
- "পেট খারাপ হয়েছে নাকি রে?" জগাদাই বা ছাড়বে কেন!
- খুব ব্যাজার মুখে কবি বল্ল, না রে বাবা, ওসব কিছু নয়।আজ আমার খুব মন খারাপ।
সেকি রে? কেন? তোদের অফিস আজ ছুটি দেয় নি বলে?
নাহ
তাহলে?
হাসবে না তো তোমরা? আসলে আজ সকালে না একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেছে আর তার পর থেকেই খুব মনটা খারাপ লাগছে।
কি দেখলি আবার?
দেখিলাম যে বাবা এক্টা নতুন বাইক কিনে দিয়েছে।
ওমা এতো ভালো কথা রে,আনন্দের কথা, এতে আবার মন খারাপ হবে কেন?
ধুত্তেরী, শোনোনা পুরোটা।
হ্যাঁ বল,
নতুন বাইকটা নিয়ে সিধে কল্যানী এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে যাচ্ছি,
তারপর....
তারপর... কি তারপর? বলবি তো?
হ্যাঁ তারপর দেখি কি আমার এক্সিডেন্ট হয়েছে আর আমি মরে গেছি।
দূর পাগল, স্বপ্ন তো স্বপ্নই হয়, এই নিয়ে কেউ মন খারাপ করে? পাগল না পাজামা?
আপনি বুঝছেন না রায়দা, ধরুন সকালে উঠে আপনি দেখতে পেলেন...আপনার দেহটা শুধু পড়ে আছে ।দেহটাকে ঘিরে সবাই হাঁউমাউ করে কাদছে । সবার মুখ গুলোই আপনার পরিচিত ... ... কেউ আপনাকে জড়িয়ে ধরে মাথা ঠুকে কাঁদছে...কেউ
আপনার ঠাণ্ডা হাত ধরে ঝাঁকাচ্ছে আপনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য ...আপনি ভাবছেন সবাই আপনাকে ঘিরে কাঁদছে কেন ? তারপর,আপনি হয়ত তখন কারো পাশে বসে বললেন "এই যে আমি" ... ... কেউ আপনার কথা শুনছ না ...কাউকে আপনি বুঝাতে পারছেন না আপনার কথাগুলো ...আপনার অস্তিত্বটাই হঠৎ করে নেই হয়ে যাওয়টা যে কি যন্ত্রণার, সে স্বপ্নেই মালুম পেয়ে গেছি আজ। তারপর থেকেই আর কিছু ভালো লাগছে না।
আমরা চুপ করে রইলাম ছেলেটার বলার ভঙ্গীতেই এমন একটা অসহায়তা ছিল যে মন খারাপের ছোঁয়াচে রোগটা আমাদের মধ্যেও ছড়িয়ে গেল।
- আরে বাবা দুঃস্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। তাবলে এমন মন খারাপ করে বসে থাকি নাকি? এই তো পরশুদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে আমাদের দু কামরার ফ্ল্যাটে পার্মানেন্টলি থাকবে বলে চলে এসেছে,ঘুমের মধ্যেই কি কান্না আমার। শেষে বউয়ের কোঁৎকা খেয়ে বুঝলাম স্বপ্ন দেখছি। সত্যি কি আর ওরা এসেছে নাকি? তুই ও যেমন।
একটা কাজ করতে পারিস কবি, একটা পুজো দিয়ে দিস মায়ের নামে,তোরা আজকালকার ছেলেছোকরা, এসব মানিস না জানি, আমার ছেলেও পাত্তা দেয়না এসবে, তাও বলি কি পুজোটা দিয়েই নে
ঠিক বলেছ গো বসুধাদি, ঠনঠনিয়া তে নেমে যাই আজ, কি বলো?
তাই যা। ঠনঠনিয়া আসতে নেমে গেল কবি। তখনই আমার মোবাইল্টা বেজে উঠলো, আরে সনাতন দা ফোন করছে এখন?
গুড মর্নিং সনাতনদা, আজ ডুব দিলে যে বড়?
আমি তোদের বৌদিকে ওর ভাইয়ের বাড়ি রানাঘাটে ছাড়তে গেছিলাম। কাল শ্বশুরমশাইয়ের বাৎসরিক কিনা, আচ্ছা শোন,যে জন্য ফোন করেছি, একটা বাজে খবর আছে।আজ সকালে আমাদের কবির একটা বিচ্ছিরি রকমের এক্সিডেন্ট হয়েছে, ছেলেটা মারা গেছে রে, একদম স্পট ডেড।তোরা ডিরেক্ট মেডিকেলে চলে আয়। আমি এখানেই আছি।সবাইকে বলে দে, আমি আর জনে জনে ফোন করছিনা, কেমন?.
কল শেষ হয়ে গেলেও মোবাইলটা কানেই ধরে আছি। দুচ্ছাই। কি যে বলেনা সনাতনদা, সাতসকালে এসব ইয়ার্কি একদম পোষায় না। বালাই ষাট, মারা যাবে কেন। কবি তো এখন ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পুজো দিচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন