গল্পকারের শেষ গল্প
সান্ত্বনা চ্যাটার্জী
রোজকার মতনই অফিসে অফিসে ঘুরে চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ভিড় বাসে বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ করেই চোখে পড়লো রাস্তার ধারে একটি বুড়ো লোক ভিক্ষার কৌটো হাতে বসে। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল, কেষ্টদা না?
স্টপেজ এসে গেছিল , বাস থেকে নেমে লোকটার দিকে এগিয়ে গেলাম । ইতস্তত করে ডাকলাম কেষ্টদা !
চমকে আমার দিকে চেয়ে খানিক থেকে কেষ্টদার চোখদুটো জ্বল জ্বল করে উঠল।
বিল্টুবাবু ! তুমি এখানে বসে কেন ! তুমি কোন্নগরে থাকতে না?
.......
কোন্নগরে আমার মামাবাড়ি আর কেষ্টদা সেখানে বাড়ির কাজ করত। আমাদের মানে বাড়ির ছোটোদের সংগে খুব প্রিয় ছিল।
কেষ্টদা মানেই গল্পের ঝুলি । যথনই যেতাম দুপুরে আর রাতে খাবার পর আমাদের শোবার ঘরে কেষ্টদাকে ঘিরে গল্প শুনতে বসতাম । কত রকম গল্প ভূতের, ডাকাতের, জংগলের কেষ্টদার গল্পের ঝুলি কোনো সময় খালি হতো না।
কেষ্টদা তুমি তো লেখা পড়া জানো না তো এতো গল্প জানো কি করে?
এ সবই আমার না-লেখা গল্প ।
সব গল্প তুমি নিজে বানিয়ে বল? তুমি পড়ালেখা করলে মস্ত বড় গল্পকার হতে, তখন তোমার লেখা বই বিক্রি করেই বড় লোক হয়ে যেত।আমরা আশ্চর্য হয়ে বলতাম।
........
কি আর করব বিল্টুবাবু কপাল !
মানে !
হঠাৎ কি মনে হল কেষ্টদার মুখটা শুকনো। খাও কোথায়, থাকো কোথায় !
সামনের গলিতে একটা দোকান আছে, খুব ভালো কচুরি বানায় কেষ্টদাকে নিয়ে কচুরি আলুর দম নিলাম কেষ্টদার জন্য আমি চা নিলাম। কেষ্টদাকে কচুরি আর আলুরদম দিয়ে গেল দোকানের ছেলেটা । কেষ্টদার খাওয়া দেখে চোখ সবিয়ে নিলাম; কতদিন মনে হয় পেটে কিছু পড়েনি । আমার বুকটা ব্যথায় দুমড়ে মুচড়ে একাকার। তিন প্লেট কচুরি শেষ করে মুখ তুলল আহ্ কতো দিন পরে এমন খেলাম।
আরো দুকাপ চা আনতে দিয়ে বললাম-এবার বলো।
চা খেতে খেতে কেষ্টদা যা বলল তার সারমর্ম হলো বড় মামা মারা যাবার পর কেষ্টদার চাকরিটা রইল না। কেষ্টদা বড় মামার খাস চাকর ছিল । বড় মামা বিয়ে করেন নি, কেষ্টদাই দেখাশোনা করত। বড়মামা মারা যাবার পরে ছোটোমামা কেষ্টদার হাতে কিছু টাকা দিয়ে আর একটা ব্যাঙ্ক একাউন্ট কেষ্টদার নামে খুলে দিয়েছিলেন। এতো বছর কেষ্টদার খাওয়া থাকার কোনো খরচ ছিল না। কেষ্টদার মাইনের টাকা সেখানেই জমা হত। বেশ কিছু টাকা জমেছিল।
বাড়িতে ফিরে কেষ্টদা টাকা আর ব্যাঙ্কের বই বৌএর কাছে দিয়ে নিশ্চিন্ত। বৌ সংসার ভালই চালাচ্ছিল কিন্তু কেষ্টদার ডেঙ্গু জ্বর হওয়াতে হাসপাতালে ভর্তি ছিল , কেষ্টদা নি:সন্তান , কেষ্টদার টিপ সই দেওয়া চেক বই ছিল। সেই সুযোগে পাড়ার দর্জি হালিমের সাথে টাকা কড়ি হাতিয়ে পালায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসে দেখে ঘরের সব কিছু ফাঁকা করে নিয়ে পালিয়েছে দুজনে।
আসে পাশের লোকেরা বলল আপনি সরল মানুষ তাই বোঝেন নি, দুজনার মধ্যে অনেক দিন ধরেই চলছিল, যখন যখন ছুটিতে আসতেন তখন সামলে চলত।
হাসপাতালে বৌ কদিন ধরে আসেনি কেষ্টদা ভেবেছিল তারও জ্বর। প্রতিবেশীরা বলেছিল নাকি দক্ষিন কলকাতায় হাজরার কাছে ওরা থাকে। প্রতিবেশীদের কাছে কিছু টাকা ধার করে এসেছিল কিন্তু এখানে এসে কিছুই খুঁজে পায়নি। টাকা পয়সা শেষ এখন তাই ভিক্ষাপাত্র।
দেশে ফেরার জন্য রেল টিকিটের দাম ও হাত খরচার জন্য কেষ্টদার হাতে পর্যাপ্ত টাকা দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরলাম। মা সব শুনে বললেন সে কি, কেষ্টদার তো বৌ অনেক কম বয়সেই মারা গেছে। যতদূর জানি ওর সাত কুলে কেউ নেই। ভীষণ নেশা করত আর চুরি করত বলে মামারা ছাড়িয়ে দেয়।
হঠাৎ কি মনে হওয়ায় প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম মানিব্যাগ নেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন