“আলোয় ভরা ঘর"
বহ্নিশিখা
মাঝরাতে শোভনকে এভাবে দেখে চমকে ওঠলো রমা।
সে কিছুতেই ওকে ঘরের ভেতরে আসতে দেবে না। ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে অঝোরে কাঁদছে।
কিছুতেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না রতনের কথা। পাড়ার বখাটে টাইপ ছেলে রতন এসে বলেছে শোভনকে দেখে এলাম মদে বোর হয়ে পড়ে আছে।
রমাকে বাগে আনতে ব্যর্থ হয়ে শোভনকে মদে আসক্ত করিয়ে ছাড়লো রতন, প্রতিশোধ স্বরূপ।
--রমা, রমা বলে চিল্লাচ্ছে শোভন। আশেপাশে কয়েকজন জেগে গেছে। গলা খেকারি দিচ্ছে। অবস্থা বিরূপ দেখে রমা দরজা খুলে দিলো। ঘরে ঢুকেই শোভন ধপাস করে পড়ে গেলো ঘরের মেজেতে। বমিও করে দিলো অনেকটা। পচা গন্ধে ঘরে দম টানা দুষ্কর।
ততক্ষনে জেগে গেছে বাড়ির সকল সদস্য।
বাজারে ঢুকতেই শোভনের বাবার মনোহারি দোকান। বেশ বড়সড়। ওখানেই শোভন ভুবন দুই ভাই মিলে ব্যবসা করতো। সন্ধ্যারদিকে চলে আসতো তাদের বাবা। বাকি সময়টা ভুবনকে নিয়ে ব্যবসা চালালেও শোভন অনেক দেরি করে ঘরে ফেরে। মদে মাতাল হয়ে।
এক দিন তার বাবা তাকে দোকানে যেতে নিষেধ করে। ততো দিনে শোভন ধার-দেনা বাড়িয়ে পাহাড় সমান করেছে। আস্তে আস্তে সংসার অচল হয়ে পড়ে। প্রতিদিন তাগাদা'র পরে তাগাদা পেতে পেতে শোভনকে জিজ্ঞেস করলো কি করেছিস এতো টাকা ধার করে?
সে বলে,
-- মদ খাইছি। ওই বাড়িতে গেছি।
শোভনের বাবা ক্ষেপে গেলো, এবং বললো -
-- কি বললি?
বলতে বলতেই শোভনের বাবা স্ট্রোক করে মারা গেলো। এরপর কিছুটা নরম হয়ে গেলো শোভন। সে বুঝতে পারে রতনের সঙ্গ দোষ তাকে এতোটা নীচে নামিয়েছে। সে তো এমন ছিল না। তার জন্যই আজ তার মা নির্বাক। শোক দুঃখ বুঝে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পেটের খিদের চেয়ে বড় জ্বালা নেই। শোভন দেখে, মা শুধু বলে, রমা ভাত দেও।
ভুবন, ছোট দুটো বোন অঝোরে কাঁদে। রমা দেখে, মায়া লাগে তার। তাদের বাবা মারা গেছে দুদিন হল। পেটে দানা পানি পড়েনি তার আগে থেকে। রমা শোভনকে বুঝায়।
বাড়িওয়ালা বাড়ি ছাড়াতে বাধ্য করে। বাঁধানো শাখা সাবিত্রী বন্ধক রেখে রমা সবাইকে নিয়ে বস্তিতে ওঠে।
বাড়তে থাকে রতনের দাপট। রমা কাঁদে। নিজেকে আর ননদ দুটোকে কিভাবে ওর হাত থেকে বাঁচাবে, সেই চিন্তায়।
সেদিন সন্ধ্যায় রতনের সাথে রমার প্রচুর কথা কাটাকাটির পর রতন বলে গেলো রাইতে রেডি থাহিস রমা, নাইলে খবর আছে।
রমাও ছেড়ে দেয়নি, সে বললো আইসা দেহিস ঝাটা নিয়ে রেডি থাহুম। রতন চলে গেলে মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে রমা ঘুমিয়ে পড়লো। হঠাৎ সমস্ত ঘর আলোয় ভরে গেলো। কে যেনো বলছে "কাঁদিস না রমা ওঠ। রান্নাঘরে যে চাল ডাল আটা তেল আছে তা দিয়ে খাবার বানিয়ে বিক্রি কর। তোরা সবাই মিলে কাজ কর। কোন সমস্যা থাকবে না। রতন তোর কাছে আসতে পারবে না কোনদিন। কাল আমার পূজো দিয়ে শুরু কর। "
মা মা বলে চিৎকার করে ডেকে ওঠলো রমা।
চোখ মুছে দৌড়ে রান্নার ঘর কোথায় আসবাব পত্রের কাছে গিয়ে দেখলো সদ্য কেনা আটা ময়দা তেল চাল ডাল লবন মরিচ পেয়াজ এক ব্যাগ ভর্তি বাজার। রমা পাগলের মত মা কালী মা কালী নাম বলছে। রমা শোভনকে, বাড়ির সবাইকে তার স্বপ্নের কথা বললো । সকলে অবাক। এতো বাজার তারা অনেক দিন করে না। এমন কেউ নেই যে এতটা সাহায্য করবে। সবার চোখে এমনই ছিল তাদের অবস্থান। এক বসাতে সকলের রাত প্রভাত হল। স্নান সেরে সকলে মন্দিরে গেলো।
আসার সময় রতনের সাথে দেখা রমার। স্ট্রেচারে করে রতনকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে রতনের বউ। রমা জিজ্ঞেস করলো, কি হল বৌদি? রতনের বউ বলে, আর বলো না, বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গেছে।
রমা আকাশের দিকে তাকিয়ে দুহাত কপালে ঠেকিয়ে বললো জয় মা, জয় মা মঙ্গলময়ী। সবার মঙ্গল করো মা। তার মনে পড়ে গেলো স্বপ্নের কথা।
ঘরে ফিরে রমা স্বপ্নের কথা মত কাজ শুরু করলো। প্রথমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে, ফুটপাতে ড্রেনের উপর দাঁড়িয়ে, তারপর নিজে ঘর নিয়ে ব্যবসা শুরু করল। এরপর রমাদের আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
রমা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। বাড়ি গাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্সে দেশের প্রথম সারির এক জন বিজনেস ম্যান। ভুলেনি শোভন রমা-স্বপ্নে দেখা মা কে। মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মায়ের পায়ে উৎসর্গ করে যাচ্ছে প্রতিদিন তাদের হৃদয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন