ভূতের কথা
ইন্দ্রনীল মজুমদার
আমি বড়োই একা। হ্যাঁ, বড়োই একা। আমার কেউ নেই। কারুর সাথে কথা বলার উপায় নেই। তাই একলাই থাকি এই বাড়িতে। বাড়ির বাইরেও যাই, তবে কেউ পাত্তা দেয় না। জোরে চিৎকার করলেও, কেউ যেন শোনে না। বড়োই কষ্ট আমার। কারুর গায়ে হাত দিয়ে ডাকলে, সে পেছনে ফেরে, এদিক-ওদিক তাকায় কিন্তু আমায় দেখে না। আসলে দেখতে পায় না। বড়োই যাতনায় আছি আমি।
এই তো সেদিন ভাবলাম একটু শরীর ধারণ করে লোককে দেখা দিই। কষ্ট হল, তবুও পারলাম কিছুক্ষণের জন্য। একজনকে দেখা দিতে। আসলে হয়েছে কি, সেদিন রাতে কাজ থেকে ফিরছিল শান্তি মাসি। এমনিতেই তো কেউ এদিকে আসে না। যাইহোক, আমি সেই সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে আমাকে দেখল কিন্তু আমাকে হঠাৎ মিলিয়ে যেতে দেখে “ভূত, ভূত। রাম, রাম।” বলে এক দৌড় মারল। তারপর থেকে দেখি এই বাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ পা রাখে না। হয়তো বুড়ি রটিয়ে বেড়িয়েছে যে এটা ভূতের বাড়ি। ঘরে ঘরে ধুলো জমে আছে। চারপাশ আগাছায় ভরে আছে। আলো সহ্যর হয় না তাই জ্বালি না। বাড়ি থেকে বেরোলেও বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে, কোনোকিছুই ভালো লাগে না। একটা চাপা বিষাদে ভুগছি।
এবার আপনাদের আমার কথা জানাই। আমি একটি ছোট-খাটো বেসরকারি অফিসে কাজ করতাম। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়াতে লকডাউনের ফলে অন্যাান্য্ ছোট-খাটো বেসরকারি সংস্থার মতো আমাদের সংস্থায় কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়। অবশেষে আর টানতে না পেরে অফিসটাই উঠে যায়। আমি বাড়িতেই বসে পড়ি। তিনকুলে আমার কেউ নেই। তাই সঞ্চিত অর্থে আমার মোটামুটি চলেই যাচ্ছিল। আনলক শুরু হওয়ার পর একদিন কম্পিউটারটা খারাপ হওয়াতে লোক ডাকতে হয়। লোক এসে ঠিক করে দিয়ে গেল বটে কিন্তু আমি এরপর বেঠিক হয়ে পড়লাম। মনে হয়, ওই কম্পিউটার সারানোর লোকটার থেকেই আমার করোনা লেগে গেছে। ওই লোকটার মুখে তেমনভাবে মাস্ক পড়া ছিল না, যা আমি তেমন গা করিনি। ওই লোকটি হয়তো ছিল অ্যাসিম্টোমেটিক। এরপর পড়লাম ঘোর বিপদে। অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন করি, অ্যাম্বুলেন্স আসে না। বেসরকারি হাসপাতালে রেট অনেক বেশি যা আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আবার অন্যেদিকে সরকারি হাসপাতালেও শুনি বেড নেই। এভাবে শরীর আস্তে আস্তে নুয়ে পড়ে। নিঃশ্বাস নিতে ক্রমাগত অসুবিধা হতে থাকে। কোনো কিছুর স্বাদ-গন্ধ পাচ্ছিলাম না। ক্লান্ত শরীরে আর না পেরে স্থানীয় ক্লাবে ফোন করি। সেখান থেকে কোনো সাহায্য পাই নি,এমনকি খবর দিয়ে দেওয়ার পর কাউকে পাওয়া গেল না। বুঝতে পারলাম সবাই একঘরে করেছে। এভাবে একদিন শেষ হয়ে গেলাম। পাশে কাউকেই পেলাম না। ভালো ভাবেই বুঝলাম যে করোনা মহামারীর চেয়ে ভয় আরও সংক্রামক। পাশের ঘরে পড়ে রয়েছে আমার দেহ যা এখন কঙ্কাল হয়ে গেছে। জানি না, কিভাবে সৎকার হবে। অত এব, আপনারা এতক্ষণ যার কথা শুনলেন অর্থাৎ আমি হলাম গিয়ে.....
যাইহোক, বুঝেই গেছেন আশা করি। করোনা থেকে বাঁচতে মাস্ক পরে বেরোবেন, বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোঁবেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবেন আর হ্যান্ড-স্যানিটাইজার
ব্যবহার করবেন। সাবধানে থাকবেন, ভালো
থাকবেন। আর বিশেষভাবে বলার যে, কাউকে
অচ্ছুৎ করবেন না। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে যথাসাধ্যা দাঁড়াবেন। রোগকে ঘৃনা করতে হবে, রোগীকে নয়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন