সম্পাদকের কলমে--

সম্পাদকের কলমে--

প্রত্যেক পত্রিকায় সম্পাদক থাকা যেমন অবশ্যম্ভাবী, ঠিক তেমনি সম্পাদকীয় লেখা অনেকটা অনিবার্য হয়ে পড়ে l আমাদের এ বারের সংখ্যা ভৌতিক, অলৌকিক বা পারলৌকিক l

ভয় মানুষকে তাড়িয়ে ফেরে l মানুষ যখন অলৌকিকতার সামনে এসে পড়ে তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, সে হতবাক হয়, বিস্মিত হয় l অলৌকিকতার অজানিত অদ্ভুত ক্রিয়া-কলাপগুলি মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করে থাকে, তাকে আতঙ্কিত ও শঙ্কিত করে তোলে। আসলে, প্রত্যেকটি মানুষ মৃত্যু ভয়ে আটকে--মৃত্যু মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ভয় ও রহস্য। আমাদের মস্তিষ্ক নামক যন্ত্রটি জগতের সবচেয়ে উন্নততর একটি যন্ত্র, এখানে তুলনাগত মান ধরলে সমস্ত মানবিক আবিষ্কারের ব্যাপারগুলি ফেল পড়ে যায় l এই ফেল বা অকৃতকার্যতার ফলস্বরূপ উঠে আসে অলৌকিকতা--সে কারণে আজও মানুষ ভূত ভৌতিক প্যারানরমাল ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ । আমাদের সমস্ত জ্ঞান পরিধির সীমানার পর থেকেই সমস্ত অলৌকিক ঘটনার সূত্রপাত ঘটে l বিজ্ঞানের কার্যকারণ সম্পর্ক সেখানে পূর্ণত অসফল।

মনের পরিচালক হল মস্তিষ্ক l আর মস্তিষ্ক বা ব্রেইন হল অটো জেনারেটর অফ থিংকিং--এটা একটা ডায়নামিক প্রক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া। মস্তিষ্কের কিছু সূক্ষ্ম সেলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকেই হয়ত আমাদের ভূত ভৌতিক প্যারানরমাল অবস্থানগুলির সৃষ্টি। মস্তিষ্কের অণু-পরমাণুর যান্ত্রিক ঘটনাগুলি আমাদের ভুল দর্শনের চিত্রপট হয়ে উঠে আসতেই পারে।

ভাবনা কল্পনা কাহিনী গড়ার জন্য আমাদের মন বড় পটু থাকে । এক শুনলে বা দেখলে তাকে একশ বানিয়ে গল্প করা মানুষের স্বভাব বললে, ভুল হবে না। আরও যেখানে এক জাগায় এসে আমরা ভীত ও অজ্ঞাত সেখানে ভৌতিক বা প্যারানরমাল ব্যাপারে আমরা খুব ভাবি, তাকে আরো অবাস্তব কল্পনা মেখে মনের মাঝে ধরে রাখতে চাই।

কোন মানুষ বা প্রাণী মরলে তাঁর আত্মা মানে অতৃপ্ত আত্মাই নাকি ভূত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। এই ভূত ও ভৌতিকতা যখন সাহিত্যাকাশের স্রোতে এসে পড়ে তখন লেখকদের রহস্য-ভাবনা নির্বাধ উড়ে বেড়ায় । মানুষের বুদ্ধির মাপকাঠির শেষ থেকেই তো শুরু হয় রহস্যময়তা, আসল রহস্য সেখানে আরও ঘনীভূত হয়ে পড়ে।

শেষমেষ যদি প্রশ্ন আসে, ভূত বলে কি আদৌ কিছু আছে ? উত্তরে, না, বললে, আমি বলবো ভুল বলছেন। আসলে আপনি এ ব্যাপারে অজ্ঞ। মন বুদ্ধির নাগালের বাইরের ব্যাপারটাই হল অলৌকিকতা। ভগবান, দেবতা, অপদেবতা, এদেরকে বিশ্বাস করতে হলে ভূতকে বিশ্বাস করা যাবে না কেন ? আসলে অলৌকিকতার মধ্য থেকেই উঠে আসে ভুত-প্রেত, আমাদের মানসিক অসুস্থতা বা মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম ব্যতিক্রমের মধ্যেও ভুত প্রেত লুকিয়ে থাকতে পারে। এত কিছুর পরেও এই একই প্রশ্ন আমাদের মনে বারবার উঠে আসে--ভূত বলে কি আদৌ কিছু আছে ? কেউ বলেন আছে। কেউ বলেন, নেই, কিন্তু "অলৌকিকতা" ব্যাপারটা যে সত্য, তা নিয়ে আমাদের মনে কোন দ্বিধা নেই। আর আমি বলব, এই অলৌকিকতার মধ্যে থেকেই ভুত-প্রেত উঠে আসে। অনেকের কাছে তা বাস্তবেও প্রকট পায়।

ভূতের ব্যাপারে আমিও এক বিশ্বাসী প্রাণী। আমার কথা কারও বিশ্বাস না হলে আমার তাতে কিছুই আসে যায় না। গল্প হিসেবে ভূতের গল্প পাঠকের উত্তেজনা বাড়ায়, রোমাঞ্চ জাগায়, আসলে রোমাঞ্চিত হওয়ার উপাদান মানুষের মনের মধ্যেই বিদ্যমান।

সে যাই হোক, আসুন বন্ধুরা, পড়ুন আমাদের এবারের ব্লগ ও ই-পত্রিকা। আমাদের বর্তমান সংখ্যার বিভিন্ন ভৌতিক গল্পগুলি পড়ে রোমাঞ্চিত হোন। আবছা অন্ধকার, পোড়ো বাড়ি, ছায়া দর্শন, ফিসফিস কথা, হঠাৎ হওয়ার ঘূর্ণিঝড় সব মিলিয়ে বিচিত্র সব কাহিনীর কথা অঙ্কিত হয়েছে আমাদের বর্তমান ভৌতিক বা প্যারানরমাল সংখ্যায়। শুভকামনান্তে--তাপসকিরণ রায়।

সহ সম্পাদকের কলমে--

এত দিন সম্পাদকের কলমই দেখেছেন আমাদের এই ব্লগের পত্রিকায়। এবং সেটাই স্বাভাবিক। সহকারী হিসেবে এটাই বলবো, আপনারা পত্রিকাটি পড়ুন এবং স্পষ্টভাবে মতামত জানান। কি ভাবে আমরা পত্রিকাকে আরও ভালো করতে পারি। আমাদের কোথাও ভুল হচ্ছে কি না। আমাদের উদ্দেশ্য আমরা ভালো লেখা হলেই সেটা প্রকাশ করবো। বারবার সম্পাদককে বলতে হবে না আমার লেখাটার কি হল। আমাদের কোন চেনা জানা কাজ করে না। আমার লেখাটা চিনি। তাই আশা রাখি আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং সম্পাদককে পত্রিকা এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবেন। ধন্যবাদান্তে--শমিত কর্মকার, সহ-সম্পাদক, বর্ণালোক।

সহ-সম্পাদকের কলমে--

আমাদের নিত্যদিনের চেনা শোনা জগতের বাইরেও যে একটা অজানা অদেখা জগত আছে, একথা অনেকেই বিশ্বাস করেন। অনেকে আবার এসব বিশ্বাস করতে চান না। আছে আর নেই এ বিষয়ে অদ্যাবধি তর্কও বড়ো কম হয়নি। পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসকে দৃঢ় করতেই হোক বা অজানা তথ্য আহরণের জন্যই হোক বসেছেন প্ল্যানচেটে, আবার মজার কথা হল এই যিনি এই ব্যপারে অবিশ্বাস করেন তিনিও তার অবিশ্বাসের ভিত সুদৃঢ় করতে ঐ একই পন্থা নেন।

বিশ্বাস আর অবিশ্বাস যেন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আবার এটাও ঠিক এমন অনেক ঘটনা ঘটে থাকে যার ব্যাখ্যাও যুক্তি বুদ্ধির অতীত।

বর্তমানের নূতন করে প্যারানরমাল বিষয় অর্থাৎ আধি দৈবিক কিংবা আধিভৌতিক বিষয়ে চর্চার জন্য তো রীতিমত আগ্রহ দেখা গেছে। একাংশের মধ্যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক সংগঠনও তৈরি হয়ে গেছে। এবারের অণুগল্পগুলির মধ্যেও এসে পড়েছে সেই অজানা-অদেখা অতীন্দ্রিয় জগতের কিছু কিছু কথা।ধন্যবাদান্তে--সাবিত্রী দাস, সহ-সম্পাদক, বর্ণালোক।

সোমবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২১

শমিত কর্মকার


 

অপাঙ্ক্তেয়

শমিত কর্মকার

 

ধুস্ আর ভালো লাগে না,সব সময় শুধু চেঁচামেচি আর মুখ ঝামটা।এই গঙ্গার ধারটাই অনেক শ্রেয়।সব করেও আজ যেন চোর ধরা পরেছি!কথাগুলো রাজশেখর বাবু ভাবছেন। ইদানিং কালে তিনি এই গঙ্গার ধারে বাঁধানো গাছটার নিচে এসে বসে থাকেন। 

রাজশেখর বাবু সরকারি চাকরি করতেন বেশ উঁচু পদেই।এক মেয়ে ছেলে আর বউকে নিয়ে সংসার।মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর তিনি অবসর গ্রহণ করেন।এরপর থেকেই ছেলে এবং ওনার স্ত্রী প্রায় সময় ওনার উপর চেঁচামেচি করে। তিনি বুঝতে পারেন না কেনতিনি বড় বাড়ি বানিয়েছেন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ছেলেও এখন যোগ্য। তিনি ভাবেন তাহলে কেন এমন করে আমার সাথে ছেলে বউ মিলে। 

সেদিন গঙ্গার ধারে রাজশেখর বাবু বসে আছেন ঠিক সেই সময় একজন ভদ্রলোক সাইকেল নিয়ে গঙ্গায় জল নিতে আসে।যাওয়ার সময় ভদ্রলোক গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে বললেন তুই আমাদের পুরনো পড়ার সেন্টু নাতুই কেন এই গঙ্গার ধারে একা একা বসেসব শুনে রাজশেখর বাবু বললেন হ্যাঁ তপনদা আমি সেন্টু। তুমি আমাকে চিনতে পেরেছো?চিনবো না তুইযে পাড়ার ভালো ছাত্র ছিলি সবাই তোকে চিনতো,তুই আমাদের গর্ব ছিলি।তা তুই কেন এখানে?পাশে বসিয়ে যখন সব বলল তখন তপনদার একটাই কথা বাড়িটা যে তোর নামে! লিখে দিলেই মরবি।


অগ্নিশ্বর সরকার

 


লৌকিক না অলৌকিক?

অগ্নিশ্বর সরকার

 

আজ আবারও বেরোতে হবে অমিতকে। পূব আকাশের কোণে সেদিনের মতো আজও সেই অদ্ভুত আভাসটা লক্ষ্য করেছে। তার মানে আজও কারোর বাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটবেই। গতবার পর্যন্ত এই অজানা বিপদের হাতে থেকে গ্রামবাসীকে ঢালের মতো রক্ষা করে যাচ্ছেএবারও কি পারবেপারতেই হবে। বুবুনের জন্য পারতেই হবে। প্রায় পাঁচশ মানুষের বাস এই গ্রামেকিন্তু আজ কোন বাড়িসময় নষ্ট না করে বেড়িয়ে পড়ল অমিত। 

আজ থেকে প্রায় বছর দুয়েক আগে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটে জ্বলন্ত পুড়ে মারা যায় অমিতের পাঁচ বছরের মেয়ে বুবুন। ওই দুর্ঘটনায় প্রবলভাবে আহত হয় অমিত। মেয়ের মৃত্যুর শোক আর আহত অংশ বিষিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় অমিতের। তার কয়েকবছর আগে একইভাবেই মৃত্যু হয় অমিতের স্ত্রীর। অমিত গ্রামেরই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলসাথে ছিল বিজ্ঞান মঞ্চের স্থায়ী সদস্য। সেদিনও বাড়ির মধ্যে এই অদ্ভুত আভাসটা লক্ষ্য করেছিল। এক সময়ের বর্ধিষ্ণু গ্রাম আজ অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। জন্ম থেকেই এই গ্রামেরই ছেলে অমিত। আজ চোখের সামনে গ্রামের এই অবস্থা দেখে কষ্ট হয়। জীবিত অবস্থা থেকেই চেষ্টা করেছিল গ্রামের অবস্থার উন্নতি করাএখনও সেটা বজায় রেখেছে। কোনও এক অজ্ঞাত শাপের করালগ্রাসে মুড়ে গেছে সুজলা-সুফলা-শ্যামলা গ্রামটা। সেই শাপের শিকড়ে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অমিত। 

ইতিমধ্যে হারাধন জেঠুর বাড়ির সামনে পৌঁছিয়েছে অমিত। গ্রামের একদম শেষের বাড়ি। গরমের জন্য বাইরের দাওয়ায় বসে আছে জেঠুজেঠিমা রান্নাঘরে। একমাত্র মেয়ে রমার বিয়ে হয়েছে তারাপীঠে। কালই আসবে বলে বাড়িতে একটা সাজো সাজো রব। রমার ছেলে অভি আর বুবুন সমবয়সী। অস্বস্তিটা আবারও অনুভব করল অমিত। উৎস সম্ভবতঃ নদীর পার থেকে। একটা অদ্ভুত হাওয়া এসে ঢুকল বাড়ির ভিতর। আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে অমিতও পিছু নিল। একটা কালো ফুটবলের চেহারা নিয়েছে অশুভ শক্তিটা। চারদিকে ঘন রোমের আবরণ। সোজা পৌঁছিয়েছে রান্নাঘরে। জেঠিমা আনাজ আনতে বেরিয়েছে। হালকা গ্যাসের গন্ধ এলো অমিতের নাকে। ওই শক্তিটাও এবার অমিতের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুততার সাথে বেড়িয়ে যাচ্ছে। অমিত তার লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে। আজই এটার শেষ করা দরকার। রুখে দাঁড়াল। শুরু হল একটা ঝটপটানি। ঘূর্ণি হাওয়ায় দুলে উঠল বাড়ির সামনের বড় অশ্বত্থগাছটা। দুটো শক্তি আজ মুখোমুখি। রক্ষক আর ভক্ষক। 

জেঠিমা ভাঁড়ার ঘর থেকে জেঠুকে বলল

আপনি ঘরে গিয়ে বসুন। ঝড় উঠলো বোধ হয়। 

হাওয়াটা ভালোই লাগছে। অদ্ভুত একটা চেনা মিষ্টি গন্ধ আছে হাওয়াটায়। 

অমিত ওই কালো ফুটবলের মতো শক্তিটাকে নিয়ে চেপে ধরল শতাধিক বছরের পুরানো গাছটার গায়ে। আজ গাছটাও সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরেছে ওই অশুভ শক্তিটাকে। এই গাছের নিচে ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে ষষ্টি পুজো দিতে এসেছে অমিতআজ বৃক্ষের সেই আশিস ফেরানোর পালা। কয়েকমুহূর্তের মধ্যে অতো বড় গাছটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। জেঠু-জেঠিমা ঘটনার আকস্মিকতায় বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে এসেছে। অশুভ গোলকটাকে চেপে ধরে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল অমিত। একটা কর্ণ বিদারক আওয়াজে সশব্দে ফাটল আরও একটা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার। রান্নাঘরের চালটা উড়ে বেড়িয়ে গেল একদিকে। দুটো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠে গেল ওপরের দিকে। একটা সাদা একটা কালো। বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ ছড়িয়ে আছেকিছুটা তেঁতো কিছুটা মিষ্টি। এবার নিশ্চিত শাপমুক্ত হবে গ্রামঅমিতের বলিদান বিফল হবে না।

অনিমা মুখার্জী


 


চন্ডাল 

অনিমা মুখার্জী 


পলাশডাঙ্গা গ্রামে এক ছোট পরিবার বাস করত। স্বামী স্ত্রী দুই সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে সুখে দুঃখে বেশ কেটে যেত তাদের। এক দিন রাতে ঘটল এক অশনি  ঘটনা, আর তার পরই তাদের সংসারে নেমে এলো অন্ধকারের কালো ছায়া l

রাত তখন প্রায় তিনটে, হঠাৎ তারা একটা শব্দ শুনতে পেল। মনে হল অজ্ঞাত কোন এক বস্তু যেন তাদের উঠোনে এসে পড়ল কিন্তু তারা বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুই দেখতে পেল না। তবে পরদিন সকাল থেকেই কিছু অস্বাভাবিক  ঘটনা লক্ষ্য করল তারা--আলনায় গুছিয়ে রাখা সব জামাকাপড় অগোছাল, বিছানা লন্ডভন্ড, হাড়ির ভাত শূণ্য l

এই সব অস্বাভাবিক কান্ড দেখে তারা ভয়ে বিস্মিত হয়ে এক তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হয়। তারা তার কাছে পুরো ঘটনার বিশ্লেষণ করে। সে তান্ত্রিক সেই দিন সন্ধ্যাতেই  তাদের বাড়িতে আসে। সব দেখে শুনে সে যোগসাধনায় বসে। যোগবলে তিনি সব কিছু জানতে পারে। তান্ত্রিক বলে, কোন এক তান্ত্রিক তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধ হয়ে এই পথ দিয়েই এক বৃক্ষকে চালনা করে। তার যাওয়ার সময় প্রভাতী আলো ফুটে ওঠে আর তখনি সে চন্ডালের হাড় সেটা ছিল যোগসিদ্ধ, সেই হাড়  এই উঠোনের কোনে এক স্থানে রেখে দিয়ে যায়। যার কু প্রভাবে এই সব অলৌকিক কান্ড ঘটছে, তবে এই হাড় যে উদ্ধার করবে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবীl

নিজের জীবন বাজি রেখে কে এই কাজ করবে ? তা ছাড়া পরিবারের কেউই একে অপরকে হারাতে চায় না।  অবশেষে ওই তান্ত্রিকই এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় বলে দিল। 

সে তান্ত্রিক কিছু দিনের জন্য পরিবারের সকলকে অন্য স্থানে চলে যেতে বলে। তারপর এক ভরা অমাবস্যায় তন্ত্র গুরু যোগ বলে প্রেত জাগায়, আর অশুভ আত্মাকে সেখানে আহ্বান করে।  তন্ত্র বলে সেই অশুভ আত্মাকে নিয়ে যে স্থানে হাড় পোঁতা আছে নির্দিষ্ট করে সেই স্থানে এক কবর খোঁড়ে।  তারপর সেই হাড় উদ্ধার করে সেখানে এক বৃক্ষরোপন করে দেয় আর তার চারপাশে মন্ত্রপূতঃ এক লাল ধাগা জড়িয়ে সেখানে মহাদেবের ত্রিশূল রেখে দেয় যাতে আর কোনো অশুভ ছায়া ওই পরিবারকে না গ্রাস করতে পারে।  

পরদিন সকালে বাড়ির সবাই ফিরে এসে দেখে এক নতুন সূর্যকিরণ তাদের উঠোন আলোকিত করেছে। এরপর ঈশ্বরের কৃপায় নিশ্চিন্তে নিরাপদে তারা দিন যাপন করে।  

সমাপ্ত


রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১

জয়া গোস্বামী


 

আশীর্বাদ 

জয়া গোস্বামী 


সে দিন সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, সবাই ঘরে     আটকে। সবাই নানা রকম গল্প করছে একসাথে বসে।   আমিও আসি যোগ দিয়ে চলে যাই। বেস ভালোই      লাগছে। উপভোগ করছি। নতুন বিয়ে হয়েছে, সব কিছু মন্দ লাগছে না। এমনি সবাই নানা ধরনের গল্প বলেই চলেছে । কেউ থামে না, আমি হঠাৎ অনুভব করি ছোট কাকা এসব থেকে একটু দুরেই আছে। আমি কেমন কৌতুহল প্রকাশ করি, কাকা কিছু আপনি বলুন ।আপনার তো অনেক বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা আছে--

চুপ করে বসে থাকে কাকা কেমন আনমনে। অনেক পরে আমি দেখি সবাই কেমন চুপ করে গিয়েছে। আমি আর থাকতে পারি না। সবার কাছে এক কথা বলতে থাকি তোমরা সবাই চুপ করে গেলে কেনো ? কেউ কথা আর বলে না। তার পরে আমি নতুন বৌ, কিছু কাউর সাথে আর বলি না। রান্নার মাসি আমাকে সেদিন সব বলতে থাকলো   এক এক করে। কাকিমার মৃত্যুটা ঠিক ছিলো না সেটা বলতে  গিয়ে অনেক বার রানুপিসি ঢোক গিলে বলতে লাগলো সব কথা আমাকে। সেদিন আমার পায়ের নিচে মাটিটা সরে গেলো। আমি শুনতে লাগলাম সব কথা হা করে....আমি শুনি কাকিমা মারা যাবার পরে রোজ নাকি কাকার কাছে আসতেন, দেখা করতেন, গল্প করতেন।

আমি শুনতে থাকলাম সব কথা । আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নেমে আসে। বাড়ীটা কেমন ভুতুরে বাড়ীর আকার ধারন করে। কাউর সাথে কিছু না বলে আমি ওপরে চলে যাই-- কেমন শরীরটা ভার ভার লাগছে, মাথাটা ধরে আছে। আমি কখন ঘুমিয়ে পরেছি, কেউ জানতে পারেনি। আমি ওদের কাছে নেই, কেউ বুঝতে পারেনি। 

আমি ওদের কাছ থেকে চলে গিয়েছি ।

আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, আমার পাশে কে এসে বসে আছে। আমি স্পষ্ট দেখি আমার মাথায়কে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তার গায়ে খুব সুন্দর গন্ধ ।

আমার ঘুমটা হাল্কা হতে আমি রানুপিসি বলে হাতটা চেপে ধরি । তার পরে দেখি কেউ নেই। চিৎকার করে ডাকতে  সবাই হুড়মুড় করে ঘরে এলো। আর কাকা আস্তে করে বলে উঠলেন, চম্পা এসেছিলে-- 

আমি অবাক হয়ে শুধু কাকার মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকি। আমিও যে অনুভব করেছি কেউ আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো--কি সুমিষ্ট গন্ধ !  সারা ঘর জুরে  সবাই অনুভব করতে লাগলো । আর আমি জীবনে প্রথম ভুতের আশীর্বাদ পেলাম । এটা আমার কাছে সারা জীবন মনে থাকবে, কোন দিনই ভুলতে পারবো ন।


সাবিত্রী দাস


 

সুরভি

সাবিত্রী দাস

 

মানুষের জীবনে কখন যে কী ঘটবে জানা নেই, কীভাবে ঘটবে সেটাও তো অজানাই থাকে! আসলে একটা গড়পড়তা নিয়মের মধ্যে দিয়েই জীবনের দিন গুলি কেটে যায়, এও একধরনের অভ্যাসই বলা যায়। উল্টো দিক দিয়ে ভাবলে হয়তো অভ্যাসটাই এক সময় নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। তার বাইরে অন্যরকম কিছু যে হতে পারে ,ভাবাও যায় না। আমরা গড়পড়তা নিয়মেই জীবনের পথে চলতে পছন্দ করি। তাবলে এর বাইরে কিছু ঘটে না বা ঘটবে না সেটাও ঠিক নয়। কথাতেই আছে না ' অঘটন আজও ঘটে।' তা যদি নাই হবে তাহলে সুরভির প্রথম জীবনের প্রেমাস্পদের সঙ্গে অভাবনীয় মিলনকে কী আখ্যাই বা দেওয়া যাবে! কিশোরী সুরভি আর আলোক রঞ্জন পরস্পরকে ভালোবেসে ছিল। জাতপাতের বেড়া ডিঙিয়ে সেই ভালোবাসা অন্দরে স্থান পায় নি। বাড়ীর লোকের কথায় অন্যের ঘরণী হতে বাধ্য হয়।

সুরভি বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে ফিরে এলে তাদের ভালবাসার টান প্রবল হয়ে ওঠে। তা এতটাই দুর্বার হয়ে ওঠে যে দু বাড়ীর লোকজনই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। আলোক রঞ্জন সুরভিকে বিয়ে করে আপন করে নিতে চাইলেও পারে না। অপমানে ঘেন্নায় বাড়ী ছেড়ে কোথায় হারিয়ে যায় অনেক চেষ্টা করেও কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। সকাল দুপুর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। মধ্যবয়স্কা সুরভি,জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেবে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত! ন্যূনতম প্রয়োজন টুকু ছাড়া বাকী সময়টা তিনি কাটাতেন নারায়ণের সামনেই। প্রায়ই স্বপ্ন দেখেন, কেউ ডাকছে তাকে। একদিন রাতের আঁধার তখন সবে ফিকে হতে শুরু হয়েছে।

পূর্ব দিকে ঊষার আলো তখনো ভালো হয়ে ফুটে ওঠে নি। মৃদু-মন্দ শান্ত বাতাসে ফুলের সৌরভ। দরজায় কিসের শব্দ না! পড়িমরি করে এসে দরজা খুলে হতবাক! নারায়ণ, নারায়ণ! শান্ত সৌম্য এক বৃদ্ধ। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না, তিনি কী ভুল দেখলেন! এ যে তার সেই বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া প্রমাস্পদ আলোকরঞ্জন! যার কথা ভেবে ভেবেই কেটে গেছে জীবনের দিন গুলি। না-পাক চুলে ধরেছে পাক। তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন তার দরজায়! চোখে মুখে অনন্যসাধারণ এক আলোর ছটা।দেখছেন সুরভি,ডাকছেন তিনি। দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে ডাকছেন। সব কিছু ভুলে "তত্ত্বমসি", "তত্ত্বমসি"অর্থাৎ "তুমিই সেই" " তুমিই সেই" বলতে বলতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সেই আলোক সমুদ্রে।অনন্ত সেই আলোক সমুদ্রের মাঝে লীন হয়ে গেলেন একটি বিন্দুর মতো।


কৌস্তুভ দে সরকার

 


নানাহার পুকুর

কৌস্তুভ দে সরকার

 

গেছিলাম খগেন দা-দের গ্রামের বাড়ি, অলিহানগরে। ওর মা বোগিয়া পিঠা বানিয়েছে। সেই লোভে, খেতে। এই পিঠেটা গ্রামীণ রাজবংশী সমাজের ঐতিহ্য। পিঠেটা সম্পর্কে অন্য কোনোদিন বিস্তারিত জানাবো। আজ শুধু নামটা জানিয়ে রাখলাম। সেদিন ছিল শীতের বিকেল। স্কুল থেকে ফিরে বইখাতা রেখে হাত পা ধুয়ে সামান্য কিছু খেয়েই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। মাকে বললাম, মা, সাইকেল চালাতে যাচ্ছি। 

তখন আমি হাফপ্যান্ট, সবে হাফ প্যাটেল। কাজেই পুরোপুরি সিটে বসে সাইকেল চালানো শিখতে গেলে একটু প্র্যাকটিস তো করতে দিতেই হবে। তাই সাইকেল চালানোয় ছাড় ছিল। বাড়িতে সাইকেল ফাঁকা পরে থাকলেই চালানোর আগ্রহ ও সুযোগ বেড়ে যেত এবং তার সদ্ব্যবহারও করে নিতাম। মা বললো, বেশিদূর যাস না। আমি বললাম, না, এই তো ব্লকের মাঠে। আর বড় জোর খগেন দা-দের বাড়ি যেতে পারি। খগেন দার আমাদের বাড়িতে খুব যাতায়াত ছিল। ওরা এখানে হোস্টেলে থাকতো। বাপু মানে আমার বাবার কাছে টিউশনি পড়ত। দাদারও বন্ধু ছিল। আর বাপু যেহেতু ওদের স্কুলের বাংলা শিক্ষক, তাই পরীক্ষার খাতায় বাংলায় কত পেল সেই খবর আগাম জেনে যাবার জন্যে আমাকে হাতে রাখার চেষ্টা করত। আমিও কম না , খিদে পেলেই ওদের হোস্টেলে গিয়ে এক থাল মুড়ি খেয়ে চলে আসতাম। বলতে দ্বিধা নেই, খগেন দা আমাকে ভালোবাসতো আর খাওয়াতোও খুব। তা সেই খগেন দা আলিহানগর যেতে প্রায় আধ ঘন্টা লেগে গেল।

 আমাদের বাড়িরগলি দিয়ে বেরিয়ে পাড়ার রাস্তা ধরে সোজা প্রথমে বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড পেরোলেই সোজা রাস্তা চলে গেলে গেছে করণদিঘির সুপার মার্কেট ধরে দাতা কর্ণ রোড হয়ে মেলা এলাকায় নানাহার পুকুরের পাশ দিয়ে অনেকটা গিয়ে আলিহানগর। আগেই বলে রাখি, এই নানাহার পুকুরের জলের রং টা কালো। দেখলেই মনে হয় মাঝে খুব গভীর এই পুকুর। পুকুরের এক পাড় মানেই এই আলিহানগর যাবার রাস্তা। 

পালেরা এই পুকুরের মালিক। বোধহয় রবি পালের পুকুর এটা। এলাকায় রবি কাকা নামেই তিনি বিখ্যাত। যেমন দরাজ গলা, তেমনি তার উদার মন। আর মানুষের সাথে মিলেমিশে হেসে খেলে গল্প করে দেদারে সময় কাটাতে ভালোবাসেন দিলদার এই মানুষটি। পুকুরে মাছের খাবার দিতে দিতেই পুকুরের জল এত কালো কিনা আমার জানা নেই। তবে এই পুকুরটি কেন যেন দেখলেই মনে হয় একটু ভিন্ন জাতের। এর বিশাল ব্যাপ্তি দেখলেই কেন যেন ভয় ভয় করে। গভীর রাতে এর পাড়ে একলা এলে কারো যে গা ছমছম করবে না, সেকথা জোর গলায় কেউই বলতে পারবে না বোধহয়। 

বিকেলে সেই পুকুর সংলগ্ন এলাকা তো অবলীলায় সাইকেল চালিয়ে পার হয়ে গেলাম। কিন্তু ফেরার সময়ই ঘটলো যত বিপত্তি। খগেন দা-দের বাড়িতে গিয়ে বগিয়া, মোয়া, মাছের ঝোল, রসগোল্লা এসব মস্তি করে খেতে খেতে কখন যে পশ্চিম পাড়ে সূর্য হেলে গিয়ে উধাও হয়েছে টের পাইনি। অগত্যা সন্ধ্যার হিম আবছায়ায় সাইকেল চেপে বাড়িমুখো হলাম সাহসে বুক বেঁধেই। কিন্তু, নানাহার পুকুরের কাছে এসেই ঘটল যত বিপত্তি। ঠিক যেখান থেকে পুকুরের শুরু হয়েছে ঠিক সেখানে পৌঁছেই আমার সাইকেলের চেনটা পড়ে গেল। কি মুশকিল। একে তো অন্ধকার হয়ে এসেছে, তার উপরে কাছে দূরে কাউকেই চোখে পড়ছে না। রাস্তার পাশের প্রকান্ড বটগাছের নিচে অসহায় আমি সাইকেলের চেন তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু কেন যেন চেনটা কিছুতেই তোলা যাচ্ছে না। এদিক তুলি তো ওদিক পড়ে যায়। বেশ কয়েকবার এরকম করতে করতে শেষে শীতের মধ্যেও আমার ঘাম ছুটে গেল। ক্রমে হাত পা কাঁপার সঙ্গে বুকটাও দুরুদুরু করতে লাগলো। ঠিক এইখানে এরকম হল কেন? চেনটা কি এখানেই পড়তে হত? অন্ধকারে একপাশে পুকুরের জলের মৃদু আলোড়নের শব্দের সাথে পুকুর পাড়ের ও বটগাছের ভেতর থেকে নানা প্রজাতির পোকামাকড়ের একটানা ডেকে চলার সাথে পুকুরের জলের উপর দিয়ে বয়ে আসা হাল্কা হিমেল বাতাস ধীরে ধীরে যেন রোমাঞ্চকর সন্ধ্যার এই নিঃসঙ্গ নিঝুম নিস্তব্ধতার পিঠের লোমগুলো খাড়া করে দিয়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষন চেষ্টার পর বাবা লোকনাথের নাম নিয়ে সাইকেলের চেনটা উঠিয়ে নিতে পারলাম। ততক্ষনে পুরো কালিময় হয়ে গেছে দুইহাত। ওদিকে না তাকিয়ে এবার সাইকেলে চড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কি অবাক কান্ড। সিটে উঠতে গিয়েই পড়ে গেলাম। তিন চার বার এরকম হল। মনে হচ্ছিল যেন কোন এক অমোঘ শক্তি আমাকে বারবার সিট থেকে নামিয়ে দিচ্ছে, টেনে ধরছে আমার হাত পা, আমাকে কিছুতেই সাইকেলের সিটে বসে সাইকেল চালিয়ে আসতে দিচ্ছে না। যেন সাইকেলে উঠলেই আমার কোনো একটা বিপদ ঘটে যাবে। এখন উপায়? আর কি আশ্চর্য, অন্য সময় কত লোকজন যায় রাস্তা দিয়ে, কত সাইকেল, মোটরবাইক, গরুগাড়ি, ভ্যান রিকশা। আর আজ সব কোথায় হাপিস হল। কারুরই কি এই মুহূর্তে এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াতের বালাই নেই? ভাবতে ভাবতেই এই অনাহুত আতঙ্ক ও আশঙ্কার ঘেরাটোপে আটকে যাচ্ছিলাম যেন। শেষে বাবা লোকনাথের নাম নিয়ে বুকের মধ্যে কিভাবে যেন প্রচন্ড সাহস জমা হয়ে গেল আর "ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষন সাথে আছে ভয়টা আবার কি?" এই ছড়াটি জোরে জোরে বলতে বলতে একপ্রকার সাইকেলটাকে দৌড়িয়ে নিয়ে ওই পুকুর সংলগ্ন এলাকা পার হবার সিদ্ধান্ত নিলাম। পুকুরটা পার করে আবার কি করে অবলীলায় সাইকেলে উঠে বাকি রাস্তা চালিয়ে চলে এলাম, ভাবতে আজো অবাক হয়ে যাই। 

পুকুরের ওখানে আমার সাথে ঠিক কি কি ঘটনা ঘটেছিল বা কেন ওরকম হয়েছিল, সেকথা কিন্তু আজো সেভাবে কাউকে বলি নাই।

ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 


ভৌতিক হলেও সত্যি

ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

 

গল্পটা বিধুদা বলেছিল। এমনিতে অলৌকিক কাহিনী তে আমার বিশ্বাস হয় না। তবে বিধুশেখর মুখুজ্যে বললে অবিশ্বাসটা করি কী করে। তবে সত্যি একটা কথা বলছি। ভূত না থাকলেও ভয়টা আছেই। তাই রাতের বেলা মনে পড়লে গা ছমছম করে। 

বিধুদার বাড়ি ছিল মেলকি তে। অজ পাড়া গাঁ। ওখানেই এক সুদখোর লোক বাস করতো। টাকার কুমীর যাকে বলে তাই ছিল লোকটা। থুরি!নামটা বলা হয় নি। ওর নাম ছিল অনন্ত। মক্ষীচুষ লোক মাইরি। 

চারিদিকে অনন্ত সুদে টাকা খাটাতো। বিধুদা নিজেও মায়ের অসুখের সময় ধার নিয়েছিল। আসল না দাও ক্ষতি নেই। মাসের শেষে সুদ দিয়ে দাও। অনন্ত খুশি। 

কিন্তু ঘটনাটা ওখানেই শেষ নয়। একদিন টাকার তাগাদা করতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়লো অনন্ত। রেললাইনের উপরে ওর দেহটা অনেকেই দেখলো। একটা পা কাটা । 

অনন্তের মৃত্যুর খবরে অনেকেই আনন্দ পেল। যাকগে। আর সুদ গুনতে হবে না। বিধুদার ও হয়ত স্বস্তি হয়েছিল। তবে মুখে সবাই বলতে লাগল আহা! মানুষটা মরে গেল। 

তেরাত্রি পার হল না। কেষ্টর বৌ পুকুর ঘাটে যাচ্ছিল। হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো। একটা সাদা কাপড় পরা খোঁড়া মানুষ একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আর নাকি সুরে বলছে "ওঁই কেঁষ্টার বৌঁ। টঁকাঁ দেঁ।" 

ওরে বাবা রে বলে কেষ্টর বৌ দাঁত ছরকুটে পরে রইল। 

গ্রামের সব লোক জেনে গেল অনন্ত ভূত হয়ে টাকা চাইছে। উফফ!মরেও টাকা টাকা করছে। আবার কেউ কেউ বললে ও অনন্ত হয় নাকি!চিটিংবাজি করে কেউ অনন্ত সেজে টাকা উপায়ের ফিকির খুঁজছে। কথায় আছে"রূপায়া ইতনা চিজ/খোদা কা উনিশ বিশ"। 

মেলকির বিনোদিনী কে চেনে না এমন মানুষ নেই। বেশ চটক আছে সাজগোজের। তার উপরে ঠমক ঠমক চলন।পা এ নুপূর পরে। অনন্ত ওকে খুব ভালোবাসতো। ভোরের দিকে ঘুমটা ওর আসবো আসবো করছে তখন ই শুনতে পেলো" ওঁবিঁনু। দঁরজাঁটা খোঁল নাঁ।" তবে ওর কাছে টাকা চাইতে যায় নি।বিনোদ তো পাড়া তোলপাড় করে চেঁচাতে লাগল। 

মাকে ভালো করতে গিয়ে দেনাটা করেছিল বিধুদা। এখন তো সুদে আসলে আশি হাজার হয়ে গেছে।এখন যদি অনন্ত ওর কাছে আসে টাকা চাইতে। কী হবে তাহলে!এইসব চিন্তা শান্তি দেয় না। 

শ্রাবণ মাসের দিন ।ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার একটা পাল্লা ভাঙা। বারবার খুলে যাচ্ছে। দূরদূর।ভাল্লাগে না।বন্ধ করতে দ্বিতীয় বার উঠে দেখে অনন্ত। উরিব্বাস! 

অনন্ত বললে কীঁ রেঁ বিঁধু। টঁকাঁ দে। আমতা আমতা করে বিধু বললে অ্যাই!তুই তো মরে গেছিস। কী হবে টাকা নিয়ে

অনন্ত রেগে কাঁই। বললে ঘঁড় মঁটকাবো তঁর।তখন বিধু বললে দেখ ভাই। রাগ করিস নি। তোর ভূত হয়ে অনেক খেমতা।যদি একটা কথা রাখিস তো একটা বুদ্ধি দিই।অনন্ত হাসলে।বললে বঁল।শুঁনি। 

বিধু বললে জানিস তো সামনে ভোট।তুই শুধু কটা ভোট ভূত হয়ে গিয়ে এই চিহ্নে টিপে দিবি।পার্টি জিতলেএত্তো টাকা।ওহহহ। 

বললে বিশ্বাস করবে কিনা জানি না। সে বারে বিধুদার দল জিতেছিল। এখন এটাই বিশ্বাস জন্মেছে যে টাকার টানে ভূত আসবেই আসবে।


সোম নাথ বেনিয়া



চার নম্বর

সোম নাথ বেনিয়া

 

শীতকালের বিয়ে বাড়ি। বিয়ে বাড়ির ভোজ শেষে ওরা তিন জন ফিরছে। কেউ পান চিবোচ্ছে। কেউ টুথ পিক দিয়ে দাঁতের ফাঁকে খোঁচাচ্ছে। রাস্তা পিচের। রাস্তার উপরে ল্যাম্প-পোস্টের আলো-আঁধারি খেলা চলছে। তিন জনে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একে বাঙালি, মায় ভোজ। সুতরাং ভালোমন্দের আলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। কেউ বললো, "মাংসটা কেমন ছেড়ে-ছেড়ে গেছে।" কেউ বললো, "গুড়ের রসগোল্লা করলে পারতো। এই সময় লোকে গুড় খাবে না তো কখন খাবে।" অন্যজন বললো, "খাওয়া-দাওয়া মোটের উপর বাঙালিয়ানায় হয়েছে।" বাড়ির দিকে এইভাবে এগোতে-এগোতে ওরা কখন চার জন হয়ে গেছে কেউ টের পায়নি। তিন জন হঠাৎ খেয়াল করলো ওদের সঙ্গে আরও একজন কেউ হাঁটছে। কিন্তু কে? বাকিরা ওকে চেনেও না, জানেও না। চার নম্বর লোকটি নিজের মতো ওদের পাশাপাশি হাঁটছে। ওরা তিন জন যেন কোনো ধাঁধার মধ্যে পড়ে সম্মোহিত হয়ে তাকে দেখছে। লোকটির হাঁটাচলায় কিছুটা অস্বাভাবিকতার ছাপ আছে। ওদের ভয় করতে শুরু করলো। তিন জনের মধ্যে ইতিমধ্যেই একটা গা ছমছমে পরিবেশ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ওরা ঠিক করলো মাঝেমধ্যেি আগুপিছু হয়ে হাঁটবে। কখনো-বা ধীরে, কখনো-বা জোরে। দেখা যাক কী হয়! দেখা গেল তারা আস্তে হাঁটলে লোকটাও আস্তে হাঁটে। তারা দ্রুত হাঁটলে লোকটাও দ্রুত হাঁটে। এ তো মহাবিপদ হলো। এক সময় তিন জনে একটি বিষয় নিয়ে একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। সেটা হলো লোকটার শরীর থাকলেও তার কোনো ছায়া নেই। এই ভাবনায় তাদের গায়ের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠলো। শ্বাসপ্রশ্বাসের স্বাভাবিক ওঠাপড়া ব্যাহত হতে লাগলো। ওরা তিন জন হাত ধরাধরি করে চলেছে। চেষ্টা করছে কোনোরূপ ভয় না পাওয়ার কিন্তু পাশের একজন যদি তেনাদের মতো হয়, তখন ভয় না পেলে চলবে কেমন করে। ওরা তো জানে ওরা রক্ত-মাংসের শরীর। কিন্তু উনি? দেখে তাদের মনে হলেও who'll bell the cat মানে কে বলবে সে ওদের মতো কিংবা ওদের মতো নয়। এই ভাবে হাঁটতে-হাঁটতে তারা ক্লান্তি অনুভব করলো। তাই ওরা ঠিক করলো আর একটু এগোলে যে পার্ক আসবে সেখানে গিয়ে ওরা বিশ্রাম নেবে। হলোও তাই। ওরা সেই পার্কের ভিতর ঢুকে তিন জনে একটা বেঞ্চে বসলো। চার নম্বর লোকটিও ওদের সঙ্গে সেই পার্কের ভিতর ঢুকে একটা দোলনায় বসে দুলতে শুরু করলো। এ তো ভারি মজা ওরফে বিপদ হলো! এক সময় তারা খেয়াল করলো দোলনা দুলছে ঠিকই কিন্তু লোকটিকে একবার দেখা যাচ্ছে, পরক্ষণেই আবার দেখা যাচ্ছে না। এইবার তো বিষয়টাকে ওদের কাছে ভয়ানক ভৌতিক কাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। তাই আর বিলম্ব না করে ওরা তিন জন বাড়ির দিকে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে শুরু করলো। ওদের মনে হলো সেই লোকটিও ওদের সঙ্গে দৌড়াচ্ছে আর বলছে, "এত ভয় পেলে হবে। সবাইকে একদিন মরতে হবে!" 

(লেখাটি সম্পূর্ণরূপে মৌলিক এবং অপ্রকাশ) 


রাশেদ নবী

 



আপদ

রাশেদ নবী

 

আমি দ্বিধান্বিত হয়ে গাড়ি থামাই। সোজা পূর্বদিকে যাব না দক্ষিণ-পূর্বদিকেমোড়ে একটা ছোট মল দেখা যায়। ওখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করা যাক। নামার জন্য আমি গাড়ির দরজা খুলি।

মহামারির সময় কাউকে বিশ্বাস না করাই ভাল।’ 

তা ঠিক’ আমি উত্তর দিতে গিয়ে চমকে যাই। গাড়িতে কেগাড়ির দরজা খোলায় গাড়ির ভিতরে আলো জ্বলে ওঠে। বাইরে অন্ধকার। গাড়ির আলোতে পিছনের সিট পরিষ্কার দেখা যায়। কেউ নাই। সম্ভবত একটানা অনেকক্ষণ গাড়ি চালানোর কারণে আমার মাথা কাজ করছে না। 

মলের দোকানগুলো খোলাকিন্তু কোথাও কাউকে দেখা যায় না। কয়েক দোকান পরে একজন দোকানীকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করি কোনট সঠিক রাস্তা। সে আমাকে আমার গন্তব্যের ঠিকানা দিতে বলে। আমি সেল ফোন বের করে ঠিকানা খুঁজি। কিন্তু সেল ফোনের সব নাম-ঠিকানা অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে যায়। ইতস্ততভাবে দোকানীকে বলি, ‘ওইদিকের রাস্তাটাই। আমি অনেকবার গেছি… একটা পুরানা শহরএকট নতুন কলেজ ক্যাম্পাসএকটা বড় নদী পার হয়ে 

সব হাইওয়েই কোনো না কোনো বড় নদী পার হয়।’ আমার কথা থামিয়ে দিয়ে সে হাঁটতে থাকে। আমি আলো-অন্ধকারে তাকে অনুসরণ করি ‘এখানেও একটু উত্তরদিকে গেলেই একটা বড় নদী পাবে। নদীর ওপারে একটা বড় সম্মেলন কেন্দ্র। চল তোমাকে নিয়ে যা্চ্ছি।’ 

গাড়িটা এখানে রেখে যাব?’ আমি জিজ্ঞেস করি। 

গাড়িটা পকেটে নাও না!’ সে নির্বিকারভাবে উত্তর দেয়। 

ঠিক কথা।’ সাদা জিপগাড়িটা ছুঁতেই তা আমার হাতের মুঠোয় উঠে আসে। আমি তা পকেটে ভরি। 

সম্মেলন কেন্দ্রটা সত্যিই বড়। সম্মেলন কক্ষের ভিতরে অন্ধকারাচ্ছন্নবাইরে দিনের আলো। আমি বের হয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়াই। এইপাশে আমার সাদা জিপটা পার্ক করা ছিলওইপাশে গেল কি ভাবেকেউ একজন ড্রাইভারের সিটে বসেতার লম্বা চুলবড় গোঁফ। আমি পিছন ফিরে ক্ষু্ব্ধ কন্ঠে দোকানীকে বলি, ‘আামার গাড়ি ওই উজবুককে দিয়েছ কেন?’ 

দোকানীকে দেখা যায় না। সামনে ফিরে দেখি জিপগাড়িটাও নাই 

এখন কি করি

সম্মেলন কেন্দ্রের কাছেই একটা বিশাল রেষ্টুরেন্ট। ভিতরে অনেক খদ্দের। জানলার ধারে যে টেবিলে গিয়ে আমি বসি সেখানকার সবাইকে মনে হয় ঘনিষ্ঠ। জানলার বাইরে থেকে একজন হেঁড়ে গলায় চিৎকার করে বলে, ‘মহামারির সময় এরকম দলবদ্ধ পানাহার…!’ 

সবাই ভয় পেয়ে হুড়মুড় করে ছুটে বেরিয়ে যায়। আমার টেবিলের সঙ্গীদের একজন ‘চল’ বলে দৌড় দেয়। আমিও সবার সাথে দৌড়ে একটা ফাঁকা হাইওয়েতে এসে পৌঁছাই। চারদিকে অন্ধকার। রাস্তার মাঝখানে আমার জিপটা দাঁড়িয়ে। হেডলা্ইট জ্বলছে। সবাই ঠেলাঠেলি করে গাড়িতে উঠে বসেদোকানী তাদের একজন। আর উজবুকটা ড্রাইভারের সিটে বসে গোঁফে তা দিচ্ছে। 

আমার গাড়ি নিয়ে পালাচ্ছএই মহামারীর মধ্যে কোথায় পালাবে?’ আমি চেঁচিয়ে বলি। 

দোকানী মুখ বের করে বলে, ‘“আমার গাড়ি,” “আমার গাড়ি” বলে বুক ফাটিও না। একটা খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলোযাও!’ সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। 

বটে ! খেলনা গাড়ি! জিপটা ছুঁতেই তা খেলনা গাড়ি হয়ে অবলীলায় আমার হাতের তালুতে উঠে আসে। গাড়ি-দখলকারীরা ‘এই ভূতোএই ভূতো’ বলতে বলতে একে অপরকে ফুঁ দিতে দিতে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়্। চারদিক আবার আলোয় স্পষ্ট হয়। 

গাড়ি ফিরে পেয়ে আমি ড্রাইভারের সিটে উঠে বসি। 

এখনআগে ঠিক করা যাক কোনদিকে যাব।

এটি একটি ভৌতিক সংখ্যা

এটি একটি ভৌতিক সংখ্যা